আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি বা সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে তা শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন বা শিল্পকারখানার ব্যয় বাড়ায় না, বরং আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ, মূল্যস্ফীতি ও সরকারি ভর্তুকি বাড়িয়ে দেয়। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা একটি বড় সামষ্টিক অর্থনৈতিক ঝুঁকি। অন্যদিকে, সরবরাহের উৎস বহুমুখী করা, বিকল্প জ্বালানিতে বিনিয়োগ এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এ ঝুঁকি কীভাবে মোকাবিলা করা যায়, তার গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ তৈরি করেছে ইউরোপ।
সম্প্রতি থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ‘সিকিউরিটি টু প্রসপারিটি : দ্য ম্যাক্রোইকোনমিক কেস ফর কমোডিটি সিকিউরিটি’ শীর্ষক এক সেমিনারে এসব বিষয় উঠে আসে। সেমিনারে ইউরোপীয় কমিশনার ভালদিস দোমব্রোভস্কিস, বোস্টন কনসাল্টিং গ্রুপের অপর্ণা ভরদ্বাজ এবং ইবিআরডির মার্ক বোম্যান অংশ নেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতেই নরওয়ে ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিকল্প সরবরাহকারী বেছে নেওয়া, জ্বালানি অবকাঠামোর রূপান্তর এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের মাধ্যমে ইউরোপীয় অর্থনীতি কীভাবে বর্তমান বৈশ্বিক সংকটেও স্থিতিস্থাপকতা ধরে রেখেছে, তা আলোচনায় তুলে ধরা হয়।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতে দেশীয় গ্যাসের পাশাপাশি আমদানিকৃত এলএনজি ও জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভর করতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে বা কাতারসহ প্রধান সরবরাহকারীদের রপ্তানিতে ব্যাঘাত ঘটলে তা সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও ভর্তুকির ওপর চাপ সৃষ্টি করে। ইউরোপের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে আমদানির উৎস বহুমুখী করা, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো, জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনার সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তাকে সমন্বয় করার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিটি মূল্যবৃদ্ধি বা সরবরাহ সংকটের প্রতিক্রিয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে বেশি দামে পণ্য কেনার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি নিতে হবে। জ্বালানি আমদানির ঝুঁকি কমানো, দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সমন্বিত কৌশল গড়ে তুলতে পারলে সরবরাহের অনিশ্চয়তা মোকাবিলা করা সম্ভব হবে, যা দেশের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও টেকসই প্রবৃদ্ধির ভিত্তি শক্তিশালী করবে।