বিশ্বজুড়ে বাড়ছে ঋণের বোঝা, সুদ পরিশোধের ব্যয় ও বাজেট ঘাটতি। এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী ২০২৯ সালের মধ্যেই বৈশ্বিক মোট সরকারি ঋণ জিডিপির ১০০ শতাংশ ছুঁয়ে ফেলতে পারে—যে ঋণের পাহাড় গত এক শতাব্দীতে দেখেনি বিশ্ব। এই পরিস্থিতিতে দেশগুলোকে দ্রুত ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও আর্থিক শৃঙ্খলা ফেরানোর তাগিদ দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভা চলাকালে প্রকাশিত ফিসকাল মনিটর প্রতিবেদনে এই উদ্বেগের কথা জানানো হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক সরকারি ঋণ জিডিপির ৯৪ শতাংশে পৌঁছেছিল। পরিস্থিতি সামাল দিতে সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারগুলো বাধ্য হয়ে সরকারগুলোর ওপর কঠিন সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারে।
আইএমএফের রাজস্ববিষয়ক বিভাগের পরিচালক রদ্রিগো ভালদেস বলেন, বৈশ্বিক আর্থিক ঝুঁকি বাড়লেও অনেক দেশে তার যথাযথ প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় অর্থনীতিগুলোর ঋণের বোঝা ও বাজেট ঘাটতি বিশ্বজুড়ে সুদহার ও অর্থায়ন পরিস্থিতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা যুক্তরাষ্ট্রকে দ্রুত বাজেট ঘাটতি কমানোর পরামর্শ দেন এবং বলেন, কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে এই ঋণের বোঝা দূর করা সম্ভব নয়। চীনকে রপ্তানিনির্ভরতার বদলে অভ্যন্তরীণ ভোগ ও চাহিদা বাড়াতে জোর দিতে বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সুদ ও ঋণের চাপে সবচেয়ে বেশি পিষ্ট হচ্ছে নিম্ন আয়ের দেশগুলো। জর্জিয়েভা জানান, এক দশক আগে এসব দেশের রাজস্বের ৬ শতাংশ ঋণ পরিশোধে ব্যবহৃত হতো, যা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪ শতাংশে। ফলে দরিদ্র দেশের সরকারগুলোর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও সামাজিক সুরক্ষায় ব্যয় করার সুযোগ অনেকটাই সংকুচিত হয়ে আসছে।
এছাড়া, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক চাপ ও জ্বালানির উচ্চমূল্য মূল্যস্ফীতি উসকে দিচ্ছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে সুদের হার উঁচুতে আটকে থাকতে পারে, যা দুর্বল অর্থনীতিগুলোর ঋণ নেওয়ার খরচ আরও বাড়িয়ে দেবে।
আইএমএফ রাজস্ব বাড়াতে শুধু করের হার না বাড়িয়ে করব্যবস্থার ফাঁকফোকর বন্ধ এবং কর প্রশাসনের দক্ষতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছে। পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষা ও প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ বজায় রেখে অপচয়মূলক সরকারি ব্যয় কমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বৈশ্বিক এই বার্তা বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, ব্যাংক খাতের সংস্কার, বাজেট ঘাটতি সামাল দেওয়া এবং বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। যদিও এই বৈশ্বিক সভার ভিত্তিতে নির্দিষ্ট কোনো শর্ত চূড়ান্তের বিষয়টি নিশ্চিত নয়, তবে সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখতে রাজস্ব বাড়ানো ও সরকারি ব্যয়ের ফলপ্রসূ ব্যবহার নিশ্চিত করাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ।