রোহিঙ্গা ক্যাম্পে শিশুদের হাত ধরে আসছে এক সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন। কক্সবাজারের জামতলীসহ বিভিন্ন ক্যাম্পে বাল্যবিয়ে রোধ, স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি এবং ঝরে পড়া শিশুদের শিক্ষাকেন্দ্রে ফিরিয়ে আনার মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে অগ্রদূতের ভূমিকা পালন করছে শিশুরা।

জাতিসংঘের শিশুসুরক্ষা সাব-সেক্টরের তথ্য অনুযায়ী, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে শনাক্ত হওয়া শিশুসুরক্ষা ঝুঁকির প্রায় ৮ শতাংশই সরাসরি বাল্যবিয়ে বা এর সঙ্গে সম্পর্কিত, যার ৯৯ শতাংশ ভুক্তভোগীই কিশোরী বা মেয়েশিশু। এছাড়া ১৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীদের প্রায় ৭০ শতাংশ সামাজিক নানা বাধার কারণে শিক্ষার বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। এমন প্রতিকূলতার মধ্যেও চাইল্ড ক্লাব ও কিশোরী দলের মাধ্যমে শিশুরা নিজেরাই সুরক্ষার প্রথম দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ক্যাম্পের ১২ বছরের সালেমা (ছদ্মনাম) পরিবারের সিদ্ধান্তে বিয়ের মুখে পড়লেও সহপাঠী ও সুরক্ষাকর্মীদের সহায়তায় সেই বাল্যবিয়ে থামায়। শুধু নিজের বিয়ে রোখেই ক্ষান্ত হয়নি সে, বরং বাল্যবিয়ে এড়াতে কোথায় যোগাযোগ করতে হবে এবং কীভাবে নিজেকে রক্ষা করতে হবে— সেই জীবনপাঠ সে পৌঁছে দিচ্ছে অন্য কিশোরীদের দ্বারে দ্বারে। সালেমার মতো শত শত শিশু এখন ক্যাম্পে পরিবর্তন আনছে। ২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে আসা শামীমা (ছদ্মনাম) নিজের ঝুপড়ি ঘরে ছোটদের পড়ানো শুরু করেছিলেন। পরবর্তীতে শিক্ষাকেন্দ্র চালুর পর তিনি নিজেও সেখানে শিক্ষকতার দায়িত্ব নেন এবং মেয়েশিশুদের শিক্ষাকেন্দ্রে নিয়ে আসতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

বর্তমানে প্রায় ৩২০টি শিশু নেতৃত্ব দলের মাধ্যমে ৩ হাজার ২০০-এর অধিক শিশু-কিশোর যুক্ত হয়ে শুধু নিজেদের পড়াশোনা বা স্বাস্থ্যবিধি মানছে না, বরং ঝরে পড়া সহপাঠীদের বাড়ি থেকে ডেকে এনে শিক্ষাকেন্দ্রে ফিরিয়ে আনছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মতে, নিবন্ধিত শিশু সুরক্ষার ঘটনার প্রায় ২০ শতাংশই প্রথম শনাক্ত করে স্থানীয় প্রটেকশন কমিটিগুলো এবং অন্তত ২ শতাংশ ঘটনা সালেমাদের মতো শিশু ও কিশোরী ক্লাবের সদস্যরা সরাসরি প্রতিরোধ বা রিপোর্ট করছে।

শিশুদের এই স্বতঃস্ফূর্ত পরিবর্তন ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমে অভিভাবকদের দৃষ্টিভঙ্গিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। 'ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স' ও 'ব্র্যাক'-এর মতো উন্নয়ন সংস্থাগুলো হটলাইন, নিরাপদ অভিযোগ বাক্স, উঠান বৈঠক এবং ইতিবাচক অভিভাবকত্ব সেশনের মাধ্যমে পরিবার ও কমিউনিটির সহযোগিতায় বাল্যবিয়ে হ্রাস এবং সার্বিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কাজ করছে।

বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, শিশুদের এই ইতিবাচক উদ্যোগগুলোকে টেকসই করতে পরিবার, কমিউনিটি ও উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সমন্বিত সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি। কক্সবাজারের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার কার্যালয়ের অতিরিক্ত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার নাজমুল ইসলাম ভূঁইয়াও শিশুদের কল্যাণে পরিচালিত কার্যক্রমে সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন।