হাওর অঞ্চলের গবাদি পশুর খাদ্য সংকট সমাধানে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) গবেষকরা। পশুখাদ্য হিসেবে বছরে দুইবার ভুট্টা ঘাস উৎপাদন এবং তা ‘সাইলেজ’ (সংরক্ষিত পশুখাদ্য) হিসেবে সংরক্ষণের এক উদ্ভাবনী পদ্ধতি হাওরের কৃষকদের অর্থনৈতিক সচ্ছলতার পথ দেখাচ্ছে।
বাকৃবির এনিমেল নিউট্রিশন বিভাগের অধ্যাপক ড. খান মো. সাইফুল ইসলাম জানান, হাওর অঞ্চলের প্রায় ২০ লাখ হেক্টর এলাকা বছরের অর্ধেক সময় পানির নিচে তলিয়ে থাকায় গবাদি পশুর তীব্র খাদ্য সংকট দেখা দেয়। এই সমস্যার সমাধানে কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের (কেজিএফ) অর্থায়নে একটি টেকসই প্রযুক্তি প্রবর্তন করা হয়েছে।
সাধারণত দানা বা ভুট্টার জন্য চাষাবাদ না করে, এই পদ্ধতিতে কৃষকরা শুষ্ক মৌসুমে দুইবার সম্পূর্ণ ভুট্টা গাছ (সবুজ ঘাস হিসেবে) চাষ করেন। এরপর বর্ষাকালে গবাদি পশুকে খাওয়ানোর জন্য তা সাইলেজ হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়। এই দ্বৈত-চক্র পদ্ধতিতে প্রতি একরে প্রায় ৩২ দশমিক ৭ টন বায়োমাস উৎপাদিত হয়েছে, যা প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় আট গুণেরও বেশি। পাশাপাশি, সাধারণ ভুট্টার তুলনায় এই পদ্ধতিতে চার গুণেরও বেশি মুনাফা অর্জিত হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, বর্ষাকালে বন্যার সময় ভুট্টার সাইলেজ খাওয়ানোর ফলে গরুর দৈহিক ওজন হ্রাসের ঝুঁকি কমেছে। পাশাপাশি, গরুর দৈনিক গড় দুধের উৎপাদন ৩ দশমিক ৭ লিটার থেকে বেড়ে ৫ দশমিক ৫৮ লিটারে উন্নীত হয়েছে। গবেষকদের মতে, প্রচলিত ধানের খড়ের তুলনায় ভুট্টার সাইলেজ পশুকে অনেক বেশি প্রোটিন ও শক্তি সরবরাহ করে।
কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার তিন শতাধিক কৃষক এই প্রকল্পের আওতায় হাতে-কলমে এই প্রযুক্তি শিখেছেন। প্রযুক্তিটির ব্যবহারে কৃষকদের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। তবে অধ্যাপক ড. খান মো. সাইফুল ইসলাম জানান, সাইলেজ তৈরির যন্ত্রপাতির অভাব, উন্নত বীজের ঘাটতি এবং কৃষি সম্প্রসারণ সেবার সীমাবদ্ধতা এই প্রযুক্তি প্রসারে বড় চ্যালেঞ্জ।
২০২৩ সালের নভেম্বরে তিন বছর মেয়াদি এই প্রকল্পটি শুরু হয়। কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের একটি কারিগরি দল সম্প্রতি মাঠ পরিদর্শন করে এই প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসারে কৃষকদের উৎসাহিত করেছেন। গবেষকরা আশা করছেন, ফসল ও গবাদি পশুর এই সমন্বিত পদ্ধতি হাওর অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রায় আমূল পরিবর্তন আনবে।

মন্তব্য করুন
মন্তব্য সমূহ
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!