প্রবাসে নির্যাতন ও বৈষম্যের শিকার হয়ে চলতি বছরের গত ৯ মাসে ১ হাজার ৬৮৭ জন নারী শ্রমিক দেশে ফিরেছেন। এর মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি—অর্থাৎ ৯৭৯ জন নারী কর্মীই ফিরেছেন শুধু সৌদি আরব থেকে। সম্প্রতি মক্কায় বাংলাদেশ সরকারকে না জানিয়ে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা এবং প্রবাসী কর্মীদের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক তদারকি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
বিদেশ থেকে ফিরে আসা কর্মীদের কোনো সুনির্দিষ্ট বা কেন্দ্রীয় হিসাব সরকার বা কোনো সংস্থার কাছে না থাকলেও বিমানবন্দর প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের আউটপাস রিপোর্ট অনুযায়ী এই তথ্য জানা গেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ১ হাজার ৬৮৭ জন নারী কর্মীকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে সৌদি আরব থেকে সবচেয়ে বেশি ৯৭৯ জন নারী কর্মী ফিরেছেন, যা মোট সংখ্যার ৫৮.৬২ শতাংশ। এছাড়া জর্ডান থেকে ২২৭ জন, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ৭৮ জন, ভারত থেকে ৫২ জন এবং মালয়েশিয়া থেকে ৪৮ জন নারী কর্মীকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়।
মাসভিত্তিক হিসাবে দেখা যায়, জানুয়ারিতে ১২৮ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৯৭ জন, মার্চে ৩০ জন, এপ্রিলে ২৩৬ জন, মে মাসে ১৬৭ জন, জুনে ১৬৯ জন, জুলাইয়ে ৩৩১ জন, আগস্টে ৩০৯ জন এবং সেপ্টেম্বরে ২২০ জন নারী কর্মীকে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, বিদেশে গিয়ে কাঙ্ক্ষিত কাজ ও বেতন না পাওয়া, অতিরিক্ত কাজের চাপ, অসুস্থতা, পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারা, শারীরিক ও যৌন নির্যাতন, স্বাস্থ্যগত সমস্যা, পারিবারিক সমস্যা এবং ভাষাগত প্রতিবন্ধকতাসহ নানা কারণে নারী কর্মীরা দেশে ফিরতে বাধ্য হন। অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রাম (ওকাপ)-এর ২০২৫ সালের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বাধ্য হয়ে ফিরে আসা নারী কর্মীর ৯৪ শতাংশই প্রবাসে নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং ৪৭ শতাংশ নারী যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন।
অন্যদিকে, সৌদি আরবের পবিত্র মক্কায় মসজিদ এলাকায় তথাকথিত অনৈতিক কাজের অভিযোগে গত বুধবার দুই বাংলাদেশি নাগরিক—নজরুল ইসলাম আবদুল বাসির এবং সিতি আক্তারকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তবে এই সিদ্ধান্তের আগে সৌদি আরব বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি। ভিয়েনা প্রটোকল লঙ্ঘন করে তথ্য না জানিয়ে ফাঁসি কার্যকরের ঘটনায় দেশে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে গত রোববার (১৮ অক্টোবর) ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ বিন জাফর এইচ বিন আবিয়ার সঙ্গে বৈঠক করেছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (দ্বিপক্ষীয় বিষয়াবলী) নজরুল ইসলাম। বৈঠকে এ বিষয়ে সৌদি সরকারের কাছে পাঠানো নোট ভার্বালের একটি কপি হস্তান্তর করে বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে বাংলাদেশ।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে ১১ লাখ ৩২ হাজার ৩৬০ জন কর্মী বিদেশে গেলেও তার দুই-তৃতীয়াংশ (৭ লাখ ৫৫ হাজার ১৯ ৪ জন) গেছেন সৌদি আরবে। চলতি বছরেও ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭১৮ জন কর্মীর মধ্যে ৩ লাখ ১৫ হাজার ১৪৩ জনই সৌদি আরব গেছেন। অর্থাৎ, বাংলাদেশের বৈদেশিক শ্রমবাজার এখনো অনেকটাই সৌদি আরবকেন্দ্রিক ও অদক্ষ কর্মীনির্ভর।
অভিবাসন ও শরণার্থী-বিষয়ক специалист আসিফ মুনীর এ বিষয়ে বলেন, আমাদের শ্রমবাজার খাতকে সম্প্রসারিত করতে হবে এবং সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার মাধ্যমে গৃহকর্মীর কাজ কমিয়ে আনতে হবে। সৌদি আরবে গৃহকর্মীদের ক্ষেত্রে সামন্ততান্ত্রিক চিন্তাধারার কারণে অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। নারীদের শুধু তৈরি পোশাক নয়, কনস্ট্রাকশনের মতো কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়ে অন্যান্য খাতেও পাঠানো যেতে পারে। এছাড়া রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে নারীরা যেন মালিকের বাসাবাড়িতে বন্দী না থেকে হোস্টেল বা ডরমিটরিতে থাকতে পারেন, সেই ব্যবস্থা দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।