★ন্যায়পরায়ন বাদশাহ জুলকারনাইনের পরিচয়...রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে নবুয়তের সত্যতায় বাদশাহ জুলকারনাইনের ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে আল্লাহ তাআলা প্রিয় নবিকে বাদশাহ জুলকারনাইনের কিছু বর্ণনা দেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-

وَ یَسۡـَٔلُوۡنَکَ عَنۡ ذِی الۡقَرۡنَیۡنِ ؕ قُلۡ سَاَتۡلُوۡا عَلَیۡکُمۡ مِّنۡهُ ذِکۡرًا

অনুবাদ:'তারা আপনাকে জুলকারনাইন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে।বলুনঃআমি তোমাদের কাছে তাঁর কিছু অবস্থা বর্ণনা করব।'

(সুরা কাহফ:আয়াত ৮৩)

যুলকারনাইন কে ছিলেন? কোন যুগে ও কোন দেশে ছিলেন?এবং তার নাম যুলকারনাইন হল কেন? যুলকারনাইন নামকরণের হেতু সম্পর্কে বহু উক্তি ও তীব্র মতভেদ পরিদৃষ্ট হয়।কেউ বলেন,তার মাথার চুলে দুটি গুচ্ছ ছিল।তাই যুলকারনাইন (দুই গুচ্ছওয়ালা)আখ্যায়িত হয়েছেন।কেউ বলেন,পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যদেশসমূহ জয় করার কারণে যুলকারনাইন খেতাবে ভূষিত হয়েছেন।কেউ এমনও বলেছেন যে,তার মাথায় শিং-এর অনুরূপ দুটি চিহ্ন ছিল।কোন কোন বর্ণনায় এসেছে যে,তার মাথার দুই দিকে দুটি ক্ষতচিহ্ন ছিল। 

★সূত্র:ইবনে কাসির,ফাতহুল কাদির।

তবে হজরত আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে সহীহ সনদে বর্ণিত রয়েছে যে, তিনি বলেছেন, ‘যুলকারনাইন নবি বা ফেরশতা ছিলেন না, একজন নেক বান্দা ছিলেন। আল্লাহকে তিনি ভালোবেসেছিলেন, আল্লাহও তাকে ভালোবেসেছিলেন। আল্লাহর হকের ব্যাপারে অতিশয় সাবধানী ছিলেন, আল্লাহও তার কল্যাণ চেয়েছেন। তাকে তার জাতির কাছে পাঠানো হয়েছিল। তারা তার কপালে মারতে মারতে তাকে হত্যা করল। আল্লাহ তাকে আবার জীবিত করলেন, এজন্য তার নাম হল যুলকারনাইন।’ (মুখতারা ৫৫৫, ফাতহুল বারী ৬/৩৮৩)

যুলকারনাইনের ঘটনা সম্পর্কে কোরআনুল করীম যা বর্ণনা করেছে, তা এই যে, তিনি একজন সৎ ও ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ ছিলেন এবং পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যদেশসমূহ জয় করেছিলেন। এসব দেশে তিনি সুবিচার ও ইনসাফের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে তাকে লক্ষ্য অর্জনের জন্য সর্বপ্রকার সাজ-সরঞ্জাম দান করা হয়েছিল। তিনি দিগ্বিজয়ে বের হয়ে পৃথিবীর তিন প্রান্তে পৌছেছিলেন- পাশ্চাত্যের শেষ প্রান্তে, প্রাচ্যের শেষ প্রান্তে এবং উত্তরে উভয় পর্বতমালার পাদদেশ পর্যন্ত।

اِنَّا مَکَّنَّا لَهٗ فِی الۡاَرۡضِ وَ اٰتَیۡنٰهُ مِنۡ کُلِّ شَیۡءٍ سَبَبًا  فَاَتۡبَعَ سَبَبًا

‘আমি তাকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম এবং প্রত্যেক বিষয়ের কার্যোপকরণ দান করেছিলাম। অতপর তিনি এক কার্যোপকরণ অবলম্বন করলেন।' (সুরা কাহফ : আয়াত ৮৪-৮৫)

আল্লাহ তাআলা বাদশাহ যুলকারনাইনকে দেশ বিজয়েরই জন্য সে যুগে যেসব বিষয় (জিনিস) প্রয়োজনীয় ছিল, তা সবই দান করেছিলেন। যার দ্বারা সে দেশসমূহ জয় করে। শত্রুদের অহংকার মাটিতে মিশিয়ে দেয় এবং অত্যাচারী বাদশাদেরকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলে। বাদশাহ যুলকারনাইন আল্লাহ প্রদত্ত মাধ্যম থেকে অতিরিক্ত আরও কিছু মাধ্যম প্রস্তুত করল; যেমন আল্লাহর সৃষ্টি লোহা দিয়ে নানান রকমের অস্ত্র-শস্ত্র ও যন্ত্র তৈরি করা হয় এবং যেভাবে বিভিন্ন ধাতু দিয়ে বিভিন্ন জিনিস-পত্র তৈরি করা হয়।

حَتّٰۤی اِذَا بَلَغَ مَغۡرِبَ الشَّمۡسِ وَجَدَهَا تَغۡرُبُ فِیۡ عَیۡنٍ حَمِئَۃٍ وَّ وَجَدَ عِنۡدَهَا قَوۡمًا ۬ؕ قُلۡنَا یٰذَا الۡقَرۡنَیۡنِ اِمَّاۤ اَنۡ تُعَذِّبَ وَ اِمَّاۤ اَنۡ تَتَّخِذَ فِیۡهِمۡ حُسۡنًا

'অবশেষে তিনি যখন সুর্যের অস্তাচলে পৌঁছলেন; তখন তিনি সুর্যকে এক পঙ্কিল জলাশয়ে অস্ত যেতে দেখলেন এবং তিনি সেখানে এক সম্প্রদায়কে দেখতে পেলেন। আমি বললাম, হে যুলকারনাইন! আপনি তাদেরকে শাস্তি দিতে পারেন অথবা তাদেরকে সদয়ভাবে গ্রহণ করতে পারেন।' (সুরা কাহফ: আয়াত ৮৬)

কোন কোন মুফাস্‌সির বলেন, তিনি পশ্চিম দিকে দেশের পর দেশ জয় করতে করতে স্থলভাগের শেষ সীমানায় পৌঁছে যান, এরপর ছিল সমুদ্র। এটিই হচ্ছে সূর্যাস্তের সীমানার অর্থ। হাবিব ইবন হাম্মায বলেন, ‘আমি আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে বসা ছিলাম। এমতাবস্থায় এক লোক তাকে জিজ্ঞাসা করল যে, যুলকারনাইন কিভাবে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যদেশে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছিল? তিনি বললেন, ‘সুবহানাল্লাহ! আল্লাহ আকাশের মেঘকে তার নিয়ন্ত্রণাধীন করেছিলেন। পর্যাপ্ত উপায়-উপকরণ দিয়েছিলেন। এবং প্রচুর শক্তি-সামৰ্থ দান করেছিলেন। তারপর আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আরও বলব? লোকটি চুপ করলে আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুও চুপ করে যান।’ (আল-মুখতারাহ ৪০৯, ইবনে কাসির)

قَالَ اَمَّا مَنۡ ظَلَمَ فَسَوۡفَ نُعَذِّبُهٗ ثُمَّ یُرَدُّ اِلٰی رَبِّهٖ فَیُعَذِّبُهٗ عَذَابًا نُّکۡرًا وَ اَمَّا مَنۡ اٰمَنَ وَ عَمِلَ صَالِحًا فَلَهٗ جَزَآءَۨ الۡحُسۡنٰی ۚ وَ سَنَقُوۡلُ لَهٗ مِنۡ اَمۡرِنَا یُسۡرًا ‘সে বলল, ‘যে ব্যক্তি জুলুম করবে, আমি অচিরেই তাকে শাস্তি দেব। এরপর তাকে তার রবের কাছে ফিরিয়ে নেওয়া হবে। তখন তিনি তাকে কঠিন আজাব দেবেন। আর যে বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে তার জন্য প্রতিদান রয়েছে কল্যাণ এবং আমার কাজে তাকে সহজ নির্দেশ দেব।' (সুরা কাহফ : আয়াত ৮৭-৮৮)

★ইয়াজুজ-মাজুজের পরিচয় বর্ণনা...

قَالُوۡا یٰذَاالۡقَرۡنَیۡنِ اِنَّ یَاۡجُوۡجَ وَ مَاۡجُوۡجَ مُفۡسِدُوۡنَ فِی الۡاَرۡضِ فَهَلۡ نَجۡعَلُ لَکَ خَرۡجًا عَلٰۤی اَنۡ تَجۡعَلَ بَیۡنَنَا وَ بَیۡنَهُمۡ سَدًّا

'তারা বলল, হে যুলকারনাইন! ইয়াজুজ ও মাজুজ দেশে অশান্তি সৃষ্টি করেছে। আপনি বললে আমরা আপনার জন্যে কিছু কর ধার্য করব এই শর্তে যে, আপনি আমাদের ও তাদের মধ্যে একটি প্রাচীর নির্মাণ করে দেবেন।' (সুরা কাহফ : আয়াত ৯৪)

ইয়াজুজ-মাজুজ সম্পর্কে কোরআন ও হাদিসের সুস্পষ্ট বর্ণনা থেকে এতটুকু নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয় যে, ইয়াজুজ-মাজুজ মানব সম্প্রদায়ভুক্ত। অন্যান্য মানবের মত তারাও নূহ আলাইহিস সালামের সন্তান-সন্ততি। কোরআনুল করীম স্পষ্টতঃই বলেছে- وَجَعَلْنَا ذُرِّيَّتَهُ هُمُ الْبَاقِينَ (সুরা আস-সাফফাত: আয়াত ৭৭)

অর্থাৎ হজরত নুহ আলাইহিস সালামের মহাপ্লাবনের পর দুনিয়াতে যত মানুষ আছে এবং থাকবে, তারা সবাই নূহ আলাইহিস সালাম-এর সন্তান-সন্ততি হবে। ঐতিহাসিক বর্ণনা এব্যাপারে একমত যে, তারা ইয়াফেসের বংশধর।’ (মুসনাদে আহমাদ ৫/১১)

তাদের অবশিষ্ট অবস্থা সম্পর্কে সর্বাধিক বিস্তারিত ও বিশুদ্ধ হাদিস হচ্ছে হজরত নাওয়াস ইবনে সামআন রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদিসটি। সেখানে দাজ্জালের ঘটনা ও তার ধ্বংসের কথা বিস্তারিত বর্ণনার পর বলা হয়েছে-

‘এমতাবস্থায় আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করবেন, আমি আমার বান্দাদের মধ্য থেকে এমন লোক বের করব, যাদের মোকাবেলা করার শক্তি কারো নেই। কাজেই (হে ঈসা!) আপনি মুসলিমদের সমবেত করে তুর পর্বতে চলে যান। (সে মতে তিনি তাই করবেন।) এরপর আল্লাহ তাআলা ইয়াজুজ-মাজুজের রাস্তা খুলে দেবেন। তাদের দ্রুত চলার কারণে মনে হবে যেন উপর থেকে পিছলে নীচে এসে পড়ছে। তাদের প্রথম দলটি তবরিয়া উপসাগরের কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় তার পানি পান করে এমন অবস্থা করে দেবে যে, দ্বিতীয় দলটি এসে সেখানে কোনদিন পানি ছিল, একথা বিশ্বাস করতে পারবে না।

হজরত ঈসা আলাইহিস সালাম ও তার সঙ্গীরা তুর পর্বতে আশ্রয় নেবেন। অন্যান্য মুসলিমরা নিজ নিজ দূর্গে ও নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেবে। পানাহারের বস্তুসামগ্ৰী সঙ্গে থাকবে, কিন্তু তাতে ঘাটতি দেখা দেবে। ফলে একটি গরুর মস্তককে একশ দীনারের চাইতে উত্তম মনে করা হবে।

হজরত ঈসা আলাইহিস সালাম ও অন্যান্য মুসলিমরা কষ্ট লাঘবের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করবেন। (আল্লাহ দোআ কবুল করবেন) তিনি মহামারী আকারে রোগব্যাধি পাঠাবেন। ফলে, অল্প সময়ের মধ্যেই ইয়াজুজ-মাজুজের গোষ্ঠী সবাই মরে যাবে।

এরপর হজরত ঈসা আলাইহিস সালাম সঙ্গীদেরকে নিয়ে তুর পর্বত থেকে নীচে নেমে এসে দেখবেন পৃথিবীতে তাদের মৃতদেহ থেকে অর্ধহাত পরিমিত স্থানও খালি নেই এবং (মৃতদেহ পচে) অসহ্য দুৰ্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। (এ অবস্থা দেখে পুনরায়) হজরত ঈসা আলাইহিস সালাম ও তার সঙ্গীরা আল্লাহর দরবারে দোয়া করবেন। (যেন এই বিপদও দূর করে দেওয়া হয়)। আল্লাহ তাআলা এ দোয়াও কবুল করবেন এবং বিরাটাকার পাখি প্রেরণ করবেন, যাদের ঘাড় হবে উটের ঘাড়ের মত। (তারা মৃতদেহগুলো উঠিয়ে যেখানে আল্লাহ ইচ্ছা করবেন, সেখানে ফেলে দেবে)।

কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে, মৃতদেহগুলো সমুদ্রে নিক্ষেপ করবে। এরপর বৃষ্টি বর্ষিত হবে। কোন নগর ও বন্দর এ বৃষ্টি থেকে বাদ থাকবে না। ফলে সমগ্র ভূপৃষ্ঠ ধৌত হয়ে কাঁচের মত পরিস্কার হয়ে যাবে।

এরপর আল্লাহ তাআলা ভূপৃষ্ঠকে আদেশ করবেন, তোমার পেটের সমুদয় ফল-ফুল উদগীরণ করে দাও এবং নতুনভাবে তোমার বরকতসমূহ প্ৰকাশ কর। (ফলে তাই হবে এবং এমন বরকত প্রকাশিত হবে যে) একটি ডালিম একদল লোকের আহারের জন্য যথেষ্ট হবে এবং মানুষ তার ছাল দ্বারা ছাতা তৈরী করে ছায়া লাভ করবে।

দুধে এত বরকত হবে যে, একটি উষ্ট্রীর দুধ একদল লোকের জন্য, একটি গাভীর দুধ এক গোত্রের জন্য এবং একটি ছাগলের দুধ একটি পরিবারের জন্য যথেষ্ট হবে। (চল্লিশ বছর যাবত এই অসাধারণ বরকত ও শান্তি-শৃংখলা অব্যাহত থাকার পর যখন কেয়ামতের সময় সমাগত হবে; তখন) আল্লাহ তাআলা একটি মনোরম বায়ু প্রবাহিত করবেন। এর পরশে সব মুসলিমের বগলের নীচে বিশেষ এক প্রকার রোগ দেখা দেবে এবং সবাই মৃত্যুমুখে পতিত হবে; শুধু কাফের ও দুষ্ট লোকেরাই অবশিষ্ট থেকে যাবে। তারা ভূ-পৃষ্ঠে জন্তু-জানোয়ারের মত খোলাখুলিই অপকর্ম করবে। তাদের উপরই কেয়ামত আসবে।’ (মুসলিম ২৯৩৭)

হজরত আব্দুর রহমান ইবনে ইয়ায়িদের বর্ণনায় ইয়াজুজ-মাজুজের কাহিনীর আরও অধিক বিবরণ পাওয়া যায়। তাতে রয়েছেঃ তবরিয়া উপসাগর অতিক্রম করার পর ইয়াজুজ-মাজুজ বায়তুল মোকাদ্দাস সংলগ্ন পাহাড় জাবালুল-খমরে আরোহণ করে ঘোষণা করবে-

‘আমরা পৃথিবীর সমস্ত অধিবাসীকে হত্যা করেছি। এখন আকাশের অধিবাসীদের খতম করার পালা। সেমতে তারা আকাশের দিকে তীর নিক্ষেপ করবে। আল্লাহর আদেশে সে তীর রক্তরঞ্জিত হয়ে তাদের কাছে ফিরে আসবে। (যাতে বোকারা এই ভেবে আনন্দিত হবে যে, আকাশের অধিবাসীরাও শেষ হয়ে গেছে।) (মুসলিম ২৯৩৭)

অন্য হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা আদম আলাইহিস সালামকে বলবেন, ‘আপনি আপনার সন্তানদের মধ্য থেকে জাহান্নামীদেরকে তুলে আনুন। তিনি বলবেন, ‘হে আমার রব! তারা কারা? আল্লাহ বলবেন, প্রতি হাজারে নয়শত নিরান্নব্বই জন জাহান্নামী এবং মাত্র একজন জান্নাতি ৷ একথা শুনে সাহাবায়ে কেরাম শিউরে উঠলেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমাদের মধ্যে সে একজন জান্নাতি কে হবে? তিনি উত্তরে বললেন, চিন্তা করো না। তোমাদের মধ্য থেকে এক এবং ইয়াজুজ-মাজুজের মধ্য থেকে এক হাজারের হিসাবে হবে।’ (মুসলিম ২২২)

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন যে, ইয়াজুজ-মাজুজের আবির্ভাবের পরও বাইতুল্লাহর হজ ও ওমরাহ অব্যাহত থাকবে।’ (বুখারি ১৪৯০)

তাছাড়া রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একদিন ঘুম থেকে এমন অবস্থায় জেগে উঠলেন যে, তার মুখমণ্ডল ছিল রক্তিমাভ এবং মুখে এই বাক্য উচ্চারিত হচ্ছিল-

‘আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। আরবদের ধ্বংস নিকটবর্তী! আজ ইয়াজুজ-মাজুজের প্রাচীরে এতটুকু ছিদ্র হয়ে গেছে। এরপর তিনি বৃদ্ধাঙ্গুলি ও তর্জনী মিলিয়ে বৃত্ত তৈরী করে দেখান। হজরত যয়নব রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, আমি এ কথা শুনে বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমাদের মধ্যে সৎকর্মপরায়ণ লোক জীবিত থাকতেও কি ধ্বংস হয়ে যাবে? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ, ধ্বংস হতে পারে; যদি অনাচারের আধিক্য হয় ৷’ (বুখারি ৩৩৪৬, মুসলিম ২৮৮০)

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেছেন, ইয়াজুজ-মাজুজ প্রত্যেহ যুলকারনাইনের দেয়ালটি খুঁড়তে থাকে। খুঁড়তে খুঁড়তে তারা এ লৌহ-প্রাচীরের প্রান্ত সীমার এত কাছাকাছি পৌছে যায় যে, অপরপাশ্বের আলো দেখা যেতে থাকে। কিন্তু তারা একথা বলে ফিরে যায় যে, বাকী অংশটুকু আগামীকাল খুঁড়ব। কিন্তু আল্লাহ তাআলা প্রাচীরটিকে আগের মতো মজবুত অবস্থায় ফিরিয়ে নেন। পরের দিন ইয়াজুজ-মাজুজ প্রাচীর খননে নতুনভাবে আত্মনিয়োগ করে। খননকার্যে আত্মনিয়োগ ও আল্লাহ তাআলা থেকে মেরামতের এ ধারা ততদিন পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে, যতদিন ইয়াজুজ-মাজুজকে বন্ধ রাখা আল্লাহর ইচ্ছা রয়েছে। যেদিন আল্লাহ তাআলা তাদেরকে মুক্ত করার ইচ্ছা করবেন, সেদিন ওরা মেহনত শেষে বলবে, আল্লাহ ইচ্ছা করলে আমরা আগামীকাল অবশিষ্ট অংশটুকু খুঁড়ে ওপারে চলে যাব। (আল্লাহর নাম ও তাঁর ইচ্ছার উপর নির্ভর করার কারণে সেদিন ওদের তাওফিক হয়ে যাবে।) পরের দিন তারা প্রাচীরের অবশিষ্ট অংশকে তেমনি অবস্থায় পাবে এবং তারা সেটুকু খুঁড়েই প্রাচীর ভেদ করে ফেলবে।’ (তিরমিজি ৩১৫৩, ইবনে মাজাহ ৪১৯৯, মুস্তাদরাকে হাকেম ৪/৪৮৮, মুসনাদে আহমাদ ২/৫১০, ৫১১)

আল্লামা ইবনে কাসির রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ‘হাদিসের উদ্দেশ্য এই যে, ইয়াজুজ-মাজুজের প্রাচীর খনন করার কাজটি তখন শুরু হবে, যখন তাদের আবির্ভাবের সময় নিকটবর্তী হবে। কোরআনে বলা হয়েছে যে, এই প্রাচীর ছিদ্র করা যাবে না। এটা তখনকার অবস্থা, যখন যুলকারনাইন প্রাচীরটি নির্মাণ করেছিলেন। কাজেই এতে কোনো বৈপরীত্য নেই। তাছাড়া কোরআনে তারা ছিদ্র পুরোপুরি করতে পারছে না বলা হয়েছে, যা হাদিসের ভাষ্যের বিপরীত নয়।

★বাদশাহ জুলকারনাইন কর্তৃক নির্মিত প্রাচীরের বর্ণনা...

قَالَ مَا مَکَّنِّیۡ فِیۡهِ رَبِّیۡ خَیۡرٌ فَاَعِیۡنُوۡنِیۡ بِقُوَّۃٍ اَجۡعَلۡ بَیۡنَکُمۡ وَ بَیۡنَهُمۡ رَدۡمًا  اٰتُوۡنِیۡ زُبَرَ الۡحَدِیۡدِ ؕ حَتّٰۤی اِذَا سَاوٰی بَیۡنَ الصَّدَفَیۡنِ قَالَ انۡفُخُوۡا ؕ حَتّٰۤی اِذَا جَعَلَهٗ نَارًا ۙ قَالَ اٰتُوۡنِیۡۤ اُفۡرِغۡ عَلَیۡهِ قِطۡرًا  فَمَا اسۡطَاعُوۡۤا اَنۡ یَّظۡهَرُوۡهُ وَ مَا اسۡتَطَاعُوۡا لَهٗ نَقۡبًا

'তিনি বললেন, আমার পালনকর্তা আমাকে যে সামর্থ? দিয়েছেন, তাই যথেষ্ট। অতএব, তোমরা আমাকে শ্রম দিয়ে সাহায্য কর। আমি তোমাদের ও তাদের মধ্যে একটি সুদৃঢ় প্রাচীর নির্মাণ করে দেব। তোমরা আমাকে লোহার পাত এনে দাও। অবশেষে যখন পাহাড়ের মধ্যবর্তী ফাঁকা স্থান পূর্ণ হয়ে গেল, তখন তিনি বললেনঃ তোমরা হাঁপরে দম দিতে থাক। অবশেষে যখন তা আগুনে পরিণত হল, তখন তিনি বললেন, তোমরা গলিত তামা নিয়ে এস, আমি তা এর উপরে ঢেলে দেই। অতঃপর ইয়াজুজ ও মাজুজ তার উপরে আরোহণ করতে পারল না এবং তা ভেদ করতে ও সক্ষম হল না।' (সুরা কাহফ : ৯৫-৯৭)

লোহার পাতকে খুব গরম করে ওর উপর গলিত সীসা বা লোহা বা তামা ঢেলে দেওয়ায় সেই পাহাড়ী রাস্তার মাঝের প্রাচীর এত মজবুত হয়ে গেল যে, ইয়াজুজ-মাজুজের পক্ষে তা ভেঙ্গে অন্যান্য মানুষের বসতিতে আসা অসম্ভব হয়ে গেল।