চিত্রনায়িকা পরীমনির সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক ও সরকারি বাসভবনে রাত্রিযাপনের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় অবশেষে চাকরি হারাচ্ছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মো. গোলাম সাকলায়েন। তাকে সরকারি চাকরি থেকে ‘বাধ্যতামূলক অবসরে’ পাঠানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সাকলায়েনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর জন্য প্রস্তুতকৃত প্রজ্ঞাপনের সারসংক্ষেপে এরই মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ স্বাক্ষর করেছেন। চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য সারসংক্ষেপটি এখন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় হয়ে রাষ্ট্রপতির দপ্তরে পাঠানো হবে। রাষ্ট্রপতির আদেশের পরই এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।
বর্তমানে মো. গোলাম সাকলায়েন ঝিনাইদহ ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।
২০২১ সালের ৯ জুন রাতে সাভারের ঢাকা বোট ক্লাবে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগে ব্যবসায়ী নাসির ইউ মাহমুদের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন চিত্রনায়িকা পরীমনি। সেই মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা (তদন্ত কর্মকর্তা) ছিলেন এডিসি সাকলায়েন। মামলার তদন্ত করতে গিয়েই পরীমনির সঙ্গে তার পরিচয় এবং পরবর্তীতে তা অনৈতিক প্রেমের সম্পর্কে রূপ নেয়।
বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। তদন্তের স্বার্থে প্রথমে তাকে ডিবি থেকে সরিয়ে মিরপুরের পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্টে (পিওএম) এবং পরবর্তীতে ঝিনাইদহে বদলি করা হয়েছিল।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদন এবং সিআইডির ডিজিটাল ফরেনসিক রিপোর্ট বিশ্লেষণ করে সাকলায়েনের বিরুদ্ধে চাঞ্চল্যকর সব প্রমাণ পাওয়া গেছে: পুলিশ অধিদপ্তরের এলআইসি শাখার দেওয়া ফোন সিডিআর (কল ডিটেইল রেকর্ড) অনুযায়ী, ২০২১ সালের ৪ জুলাই থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত সাকলায়েন নিয়মিত বিভিন্ন সময়ে (দিনে ও রাতে) চিত্রনায়িকা পরীমনির বনানীর বাসায় অবস্থান করেছেন। পরীমনির মোবাইল থেকে জব্দ করা ফেসবুক মেসেঞ্জার এবং হোয়াটসঅ্যাপের কথোপকথন পর্যালোচনা করে তদন্ত কমিটি জানিয়েছে, তাদের মধ্যকার সম্পর্ক কোনো পেশাদার প্রয়োজনে ছিল না, বরং তা ছিল অনৈতিক প্রেমের সম্পর্ক। ২০২১ সালের ১ আগস্ট ভোর ৬টা থেকে ২ আগস্ট রাত ৩টা পর্যন্ত রাজারবাগ মধুমতি পুলিশ অফিসার্স কোয়ার্টার্সে সাকলায়েনের সরকারি বাসভবনে কাটান পরীমনি। সিসিটিভি ফুটেজ ও সাক্ষীদের জবানবন্দি অনুযায়ী, সাকলায়েনের পূর্বপরিকল্পনায় তাঁর স্ত্রী বাসায় না থাকার সুযোগে পরীমনি সেখানে যান এবং টানা ১৭ ঘণ্টা অবস্থান করেন।
তদন্ত প্রতিবেদনে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে যে, গোলাম সাকলায়েন পুলিশের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা এবং বিবাহিত ও এক সন্তানের জনক হওয়া সত্ত্বেও সরকারি চাকুরির শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে পরীমনির সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়েছেন। নিজের জন্মদিন উদযাপন এবং সরকারি বাসভবনে পরীমনিকে নিয়ে সময় কাটানোর বিষয়টি গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ায় সরকারের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে।
এই ‘অসদাচরণ’ প্রমাণিত হওয়ায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব হায়াত-উদ-দৌলা খাঁনের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটি সাকলায়েনকে গুরুদণ্ডের আওতায় এনে কেন চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হবে না, মর্মে দ্বিতীয় কারণ দর্শানো নোটিশ দেয়। সাকলায়েনের দেওয়া জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় তাকে চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়ার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়।
পরবর্তীতে ২০২৪ সালের জুনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের শৃঙ্খলা-২ শাখা থেকে সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) মতামত চাওয়া হলে পিএসসিও সরকারের সিদ্ধান্তের পক্ষে সায় দেয়। পিএসসির সেই মতামতের ওপর ভিত্তি করেই এবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সাকলায়েনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর চূড়ান্ত আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে যাচ্ছে।