মৃত্যু মানুষের জীবনের এক অবশ্যম্ভাবী সত্য। দুনিয়ার জীবন শেষ হলেও মানুষের পথচলা শেষ হয় না; বরং শুরু হয় আখিরাতের প্রথম ধাপ— কবরের জীবন। ইসলামে কবরকে হয় জান্নাতের একটি বাগিচা, অথবা জাহান্নামের একটি গর্ত হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। তাই প্রত্যেক মুমিনের মনেই কবরের আজাব থেকে নিরাপদ থাকার আকুল আকুতি থাকে।
১. সুরা আল-মুলক নিয়মিত পাঠকারী ব্যক্তি
২. পেটের রোগে মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তি
৩. আল্লাহর পথে শহীদ
৪. জুমার দিন বা জুমার রাতে মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তি
কবরের আজাব থেকে বাঁচতে আমাদের করণীয়
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
وَمِنْ وَرَائِهِمْ بَرْزَخٌ إِلَىٰ يَوْمِ يُبْعَثُونَ
‘আর তাদের সামনে রয়েছে একটি অন্তরাল (বরযখ), যেদিন তাদের পুনরুত্থিত করা হবে সেই দিন পর্যন্ত।’ (সুরা আল-মু’মিনুন: আয়াত ১০০)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বিভিন্ন হাদিসে এমন কিছু সৌভাগ্যবান মানুষের কথা উল্লেখ করেছেন, যারা কবরের আজাব ও ফিতনা থেকে বিশেষ নিরাপত্তা বা মুক্তির সুসংবাদ লাভ করবেন। নিচে এমন চারটি শ্রেণির কথা বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
যারা নিয়মিত রাতে ঘুমানোর আগে সুরা আল-মুলক তিলাওয়াত করেন, এই সুরাটি তাদের জন্য কবরে সুপারিশকারী হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
‘কুরআনের একটি সুরা, যাতে ত্রিশটি আয়াত রয়েছে, একজন ব্যক্তির জন্য সুপারিশ করবে, এমনকি তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে। সেটি হলো— ‘তাবারাকাল্লাযী বিইয়াদিহিল মুলক’ (সুরা আল-মুলক)।’ (তিরমিজি: ২৮৯১)
অন্য বর্ণনায় এসেছে, এই সুরা পাঠকারীকে কবরের আজাব থেকে স্বয়ং রক্ষা করবে।
ইসলামে কিছু নির্দিষ্ট রোগে মৃত্যুবরণকারীদের ‘শহীদি মর্যাদা’ দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হয়ে মৃত ব্যক্তিও অন্তর্ভুক্ত। হাদিসে পাকে এসেছে:
وَالْمَبْطُونُ شَهِيدٌ
‘পেটের রোগে মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তি শহীদ।’ (বুখারি: ২৮২৯, মুসলিম: ১৯১৪)
ইসলামী স্কলার ও আলেমদের মতে, শহীদদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ সম্মান থাকায় এই শ্রেণির মানুষের কবরের আজাব থেকেও মুক্তির সুসংবাদ রয়েছে।
ইসলামে জিহাদ বা আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার পথে জীবন উৎসর্গকারী শহীদের মর্যাদা আকাশচুম্বী। তারা কবরের সমস্ত পরীক্ষা ও আজাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকবেন। পবিত্র কুরআনের বাণী:
‘যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে, তাদেরকে কখনো মৃত মনে করো না; বরং তারা জীবিত, তাদের প্রতিপালকের নিকট জীবিকা প্রাপ্ত।’ (সুরা আল-ইমরান: আয়াত ১৬৯)
রাসুলুল্লাহ (সা.) শহীদের মর্যাদা প্রসঙ্গে বলেছেন:
‘শহীদের জন্য আল্লাহর কাছে ছয়টি বিশেষ মর্যাদা রয়েছে... এবং তাকে কবরের আজাব থেকে নিরাপত্তা দেওয়া হবে।’ (তিরমিজি: ১৬৬৩)
জুমার দিন বা শুক্রবার মুসলমানদের জন্য সপ্তাহের সেরা এবং একটি বরকতময় দিন। এই পবিত্র দিনে বা রাতে কোনো মুসলমান মৃত্যুবরণ করলে তার জন্য বিশেষ সুসংবাদ রয়েছে। হাদিসে এসেছে:
‘যে মুসলিম জুমার দিন অথবা জুমার রাতে মৃত্যুবরণ করে, আল্লাহ তাকে কবরের ফিতনা (পরীক্ষা ও আজাব) থেকে নিরাপদ রাখেন।’ (তিরমিজি: ১০৭৪, মুসনাদ আহমাদ)
কবরের আজাব থেকে মুক্তি শুধু বিশেষ এই চার শ্রেণির মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং ইমান, তাকওয়া, নেক আমল, খাঁটি তওবা এবং সুন্নাহর অনুসরণের মাধ্যমে যেকোনো মুমিনই আল্লাহর বিশেষ রহমত লাভ করতে পারেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজে প্রায়ই কবরের আজাব থেকে পানাহ চেয়ে এই দোয়াটি পড়তেন এবং সাহাবিদের পড়তে বলতেন:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিন আজাবিল কাবরি।
অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে কবরের আজাব থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।’ (বুখারি: ১৩৭৭, মুসলিম: ৫৮৮)
উপসংহার:
কবর হলো আখিরাতের প্রথম ঘাঁটি। যে ব্যক্তি এখানে সফল ও নিরাপদ হবে, তার পরবর্তী পথ সহজ হবে। তাই আমাদের উচিত প্রতি রাতে নিয়মিত সুরা আল-মুলক তিলাওয়াত করা, গুনাহ থেকে দূরে থেকে নেক আমলে অটল থাকা এবং সর্বদা আল্লাহর দরবারে কবরের আজাব থেকে মুক্তির জন্য আকুল প্রার্থনা করা।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কবরের আজাব, কবরের ফিতনা এবং আখিরাতের সকল কষ্ট থেকে হেফাজত করুন। আমিন।