লোহার ভারী দরজা খুলতেই চোখে পড়ে পুরোনো দ্বিতল ভবন। বাইরে থেকে মনে হবে নিছক সরকারি স্থাপনা। কিন্তু কয়েক কদম এগোতেই ফিকে হয়ে আসে আলো। দেখা মেলে একের পর এক অন্ধকার কুঠুরির। বাতাস ঢোকে না। পৌঁছায় না সূর্যের আলোও। মাত্র দুই ফুট চওড়া আর চার ফুট দৈর্ঘ্যের এমন সাতটি কক্ষের নাম রাখা হয়েছিল 'যমসেল'। দমবন্ধ করা এসব কক্ষে ঢোকার পর কেউ জানতেন না আর কখনও মুক্ত আকাশের নিচে ফিরতে পারবেন কি না। কেউ হতেন লাশ, আবার কারও হদিস আজও মেলেনি।

র‍্যাবের টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে এখনও ফুটে ওঠে এক বিভীষিকাময় সময়ের চিহ্ন। আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে বিরোধী মতাদর্শের মানুষকে গুমের পর এখানেই বন্দি রাখা হতো বছরের পর বছর। চলত অমানবিক নির্যাতন। এ গোপন বন্দিশালার প্রতিটি কক্ষ বা দেয়াল যেন আজও গুম-নির্মমতা আর মৃত্যুভয়ের নীরব সাক্ষী।

তথ্যমতে, ঢাকার উত্তরার বিমানবন্দর এলাকায় র‍্যাব-১ ব্যাটালিয়নের কম্পাউন্ডের ভেতরে অস্ত্রাগারসংলগ্ন একটি পুরোনো দোতলা ভবন রয়েছে। বাইরে থেকে সাধারণ প্রশাসনিক স্থাপনা মনে হলেও এটিই ছিল টিএফআই সেল। ২০০৯ সালে ক্ষমতার মসনদে বসে এই স্থাপনাটি গুমের অন্যতম প্রধান গোপন বন্দিশালা হিসেবে ব্যবহার করেছিল শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার। মূলত র‍্যাবের গোয়েন্দা শাখার অধীনে চলত নির্মম এসব কর্মকাণ্ড। গোপনীয়তার স্বার্থে এর কোডনেম ছিল ‘হাসপাতাল’

টিএফআই সেলের ভেতরের চিত্র

দ্বিতল এ ভবনে মোট সেল রয়েছে ২৯টি। প্রবেশমুখের সিঁড়ির ঠিক ডান পাশেই ছিল দুই ফুট চওড়া ও চার ফুট লম্বা অতিসংকীর্ণ সাতটি ‘ডেথ সেল’ বা ‘যমসেল’।

নিচতলা: ১০টি কক্ষ রয়েছে (খোলা শৌচাগারসহ গড় আয়তন ৫ ও ৮ ফুট)। দ্বিতলা: ১০ ফুট দৈর্ঘ্যের এবং ৩ বা চার ফুট প্রস্থের ১০টি কক্ষ। পাশাপাশি দুটি বড় আকারের তথাকথিত ‘ভিআইপি সেল’ (একটি ১৪ ও ১০ ফুট, অন্যটি ১০ বাই ১০ ফুটের)।

সংখ্যা বেড়ে গেলে দ্বিতীয় তলার করিডোরে ক্যানভাস বা কাপড়ের পার্টিশন দিয়ে অস্থায়ী সেলে গুমের শিকার ব্যক্তিদের রাখা হতো।

টিএফআই সেলের সবচেয়ে ভয়ংকর অংশ ছিল তিনটি সাউন্ডপ্রুফ জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ। এসব কক্ষে ঘূর্ণায়মান স্টিলের চেয়ার, বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার ব্যবস্থা, ছাদ থেকে ঝুলিয়ে রাখার ব্যবস্থা ও মই-সদৃশ লোহার বেডসহ নির্যাতনের বিভিন্ন উপকরণ ছিল। এছাড়া জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষে কাটা হাত, চোখ উপড়ে ফেলা মানুষের ছবিসহ নির্যাতনের বীভৎস ছবি টাঙিয়ে রাখা হতো।

ন্যায়বিচারের স্বার্থে প্রসিকিউশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ১ আগস্ট টিএফআই সেল পরিদর্শন করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদার, সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। তাদের সঙ্গে চিফ প্রসিকিউটরসহ পুরো প্রসিকিউশন টিম, তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তা, গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের প্ল্যাটফর্ম ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম তুলি এবং আসামিপক্ষের আইনজীবীরা উপস্থিত ছিলেন।

পরিদর্শনকালে দেখা যায়, নিচতলায় থাকা সাতটি যমসেলের মাঝের পার্টিশন দেয়াল ভেঙে একাকার করে দেওয়া হয়েছে। একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের সোজা হয়ে বসা বা স্বাভাবিকভাবে নড়াচড়ারও সেখানে কোনো সুযোগ নেই। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর ভবনের দেয়াল, দরজা, জানালা ও অভ্যন্তরীণ কাঠামোর বিভিন্ন অংশ পরিবর্তন করে গুমসংক্রান্ত সম্ভাব্য আলামতের বড় একটি অংশ মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে বলে দাবি তদন্ত সংস্থার।

জানা গেছে, ভবনটির দ্বিতীয় তলার একটি সেলে রাখা হয়েছিল ব্যারিস্টার মীর আহমেদ বিন কাশেমকে। এছাড়া সরু একটি কক্ষে দৈনিক আমার দেশের সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীসহ বহু মানুষকে এই টিএফআই সেলে রাখা হয়েছিল বলে দাবি তদন্ত সংস্থার। এমনকি ভারতে নেওয়ার আগে বর্তমান মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদকেও এখানে নিয়ে আসা হয়েছিল।

প্রসিকিউশন জানায়, টিএফআই সেলে তদন্তকালে অফিসকক্ষ থেকে তাফসিরে ইবনে কাছির, বাংলা অনুবাদ কুরআন, মাহমুদুর রহমানের লেখা বই ও ফরহাদ মজহারের বইসহ বেশ কিছু ইসলামী বই পাওয়া যায়। এসব বই গুমজীবন থেকে থানায় হস্তান্তরের সময় ভুক্তভোগীদের সামনে রেখে ‘জিহাদি বই’ হিসেবে উপস্থাপন করা হতো।

প্রসিকিউটর তাসমিরুল ইসলাম জানান, সাক্ষীদের বর্ণনামতে দেয়াল ভেঙে ১০টি সেলের সন্ধান পাওয়া গেছে। আলামত নিঃশেষ করতেই সরকার পতনের পর এসব পরিবর্তন আনা হয়েছে।

গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনে ১ হাজার ৯০০টি আবেদন জমা পড়েছে, যার মধ্যে গুমের পর যাদের আর ফিরে পাওয়া যায়নি এমন সংখ্যা ২৫০-এরও বেশি। ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম তুলি বলেন, নির্যাতনে মৃত্যুর পর মরদেহ কেটে বস্তাবন্দি করে নদীতে ফেলে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। শুধুমাত্র ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য এমন হাজারো মানুষের প্রাণ নিয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার।

চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, "আয়নাঘর কোনো রূপকথার গল্প নয়।" তৎকালীন রাষ্ট্র পরিচালনাকারীদের ফ্যাসিবাদী চরিত্র এই গোপন নির্যাতনকেন্দ্রের মাধ্যমেই উন্মোচিত হয়েছে। সুপিরিয়র রেসপনসেবিলিটিতে যারা মাঠপর্যায়ে ছিলেন বা মানবতাবিরোধী অপরাধ সংগঠনে সহায়তা করেছিলেন, তাদের প্রত্যেককেই আইনের আওতায় আনার লক্ষ্যে প্রসিকিউশন টিম কাজ করছে।

ভাঙা দেয়াল আর মুছে ফেলা চিহ্ন হয়তো টিএফআই সেলের অনেক আলামত আড়াল করেছে, তবুও সংকীর্ণ যমসেল ও সাউন্ডপ্রুফ জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষগুলো আজও সাক্ষ্য দিচ্ছে সেই বিভীষিকাময় সময়ের, যেখান থেকে অনেকেই আর মুক্ত আকাশের নিচে ফিরে আসেননি।