ঠাকুরগাঁও-১ (সদর, রুহিয়া ও ভুল্লী) আসনের উপনির্বাচনে বিএনপি প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারে অংশ নেওয়ার অভিযোগে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. জুলফিকার রহমানের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করার নির্দেশ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে মামলা করে দ্রুত নিষ্পত্তি করতে বলা হয়েছে।

বুধবার নির্বাচন পরিচালনা-২ অধিশাখার উপসচিব মোহাম্মদ মনির হোসেন স্বাক্ষরিত এ-সংক্রান্ত একটি চিঠি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে পাঠানো হয়। অভিযুক্ত জুলফিকার রহমান রুহিয়া উপজেলার আরাজী দক্ষিণ বঠিনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক এবং তিনি রুহিয়া উপজেলার সেনুয়া ইউনিয়নের চামেশ্বরী চৌধুরীহাট এলাকার মৃত সোলেমান মাস্টারের ছেলে।

নির্বাচন কমিশনের চিঠিতে বলা হয়, ২৯ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে জুলফিকার রহমান সেনুয়া ইউনিয়নে বিএনপি প্রার্থীর নির্বাচনী কার্যালয় উদ্বোধনসহ বিভিন্ন নির্বাচনী কর্মসূচিতে বক্তব্য দেন এবং এসব বক্তব্যের ভিডিও নিজের ফেসবুক আইডিতে প্রকাশ করেন। নির্বাচনী অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটির অনুসন্ধানেও এসব ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেছে।

চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯ এবং নির্বাচন আইন অনুযায়ী সরকারি কর্মচারীদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ কিংবা কোনো প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালানোর সুযোগ নেই। কিন্তু জুলফিকার রহমান এসব বিধিনিষেধ অমান্য করে প্রকাশ্যে একটি রাজনৈতিক দলের প্রার্থীর পক্ষে প্রচার ও সমর্থন জানিয়েছেন। এ কারণে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করে দ্রুত নিষ্পত্তি এবং গৃহীত ব্যবস্থা কমিশনকে অবহিত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এর আগে গত ১৩ অক্টোবর বিএনপি প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণায় অংশ নেওয়ার অভিযোগে জুলফিকার রহমানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দেয় নির্বাচনী অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটি। জামায়াতে ইসলামীর ঠাকুরগাঁও পৌর যুব বিভাগের সভাপতি মো. রাজিউর রহমানের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে সশরীরে উপস্থিত হয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়। পরে ১৯ অক্টোবর কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও পীরগঞ্জ জজ আদালতের সিভিল জজ মো. তোসিকুল আলমের আদালতে লিখিত জবাব দেন ওই শিক্ষক। জবাবে নিজের কর্মকাণ্ডকে অনিচ্ছাকৃত ভুল উল্লেখ করে ভবিষ্যতে এমন কাজ আর করবেন না বলে অঙ্গীকার করেন এবং অভিযোগ থেকে অব্যাহতি চান।

তবে লিখিত জবাব দেওয়ার পরও জুলফিকার রহমান তার ফেসবুকে ‘জুলফিকারকে এভাবে থামানো যায় না? দ্বিগুণ বেগে, ঝড়ের গতিতে, সাইক্লোনের মহাপ্লাবনে চলমান যুদ্ধের রক্তাক্ত প্রান্তরে প্রতিদিন, প্রতিক্ষণ জ্বলে উঠবে তোমাদের মূর্তিমান আতঙ্ক’—এমন বক্তব্য প্রকাশ করেন।

নির্বাচনী অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটির আদেশে বলা হয়, জুলফিকার রহমানের ফেসবুক আইডি পর্যালোচনায় দেখা যায়, তিনি গত ৩০ সেপ্টেম্বর ‘উপনির্বাচন ঠাকুরগাঁও-১, মির্জা ফয়সল আমিনকে ধানের শীষে ভোট দিন’ ক্যাপশনে একটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেন। অথচ ওই আসনে প্রতীক বরাদ্দের দিন ৮ অক্টোবর থেকে নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর কথা ছিল। অর্থাৎ, প্রতীক বরাদ্দের আগেই তিনি একজন প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালান। তার এসব কর্মকাণ্ডে সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০২৫-এর ২১(ক), ২১(খ) ও ১৮ বিধি লঙ্ঘিত হয়েছে বলে কমিটির কাছে প্রতীয়মান হয়েছে।

এ বিষয়ে জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও ঠাকুরগাঁও-১ আসনের রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম বলেন, গত বুধবার তারা নির্বাচন কমিশনের একটি চিঠি হাতে পেয়েছেন, যেখানে শিক্ষক মো. জুলফিকার রহমানের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করার জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনী কার্যক্রমের ব্যস্ততার কারণে চিঠিটি সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মোফাজ্জল হোসেন বলেন, নির্বাচনী বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে শিক্ষক জুলফিকার রহমানকে নির্বাচনী অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটি কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছিল এবং তিনি নোটিশের জবাবও দিয়েছেন। তবে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করার নির্দেশ-সংক্রান্ত নির্বাচন কমিশনের কোনো চিঠি তিনি এখনো পাননি, বিষয়টি কেবল শুনেছেন।

এ বিষয়ে জানতে শিক্ষক মো. জুলফিকার রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।