দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ জনপদ এখন পানির নিচে। সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, বাঁশখালী, চন্দনাইশসহ বিভিন্ন এলাকায় বন্যার ভয়াবহতা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার পেছনে শুধু অতিবৃষ্টি বা পাহাড়ি ঢলকে একমাত্র কারণ হিসেবে দেখছেন না স্থানীয় বাসিন্দা ও বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, পরিবেশগত অব্যবস্থাপনা, নদী-খাল দখল, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ এবং প্রাকৃতিক জলাধার ধ্বংসের ফলে পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথগুলো রুদ্ধ হয়ে পড়েছে।
বান্দরবানের পাহাড়ি এলাকা থেকে উৎপত্তি হওয়া হাঙ্গর খালসহ এই অঞ্চলের অসংখ্য শাখা খাল এখন অস্তিত্ব সংকটে। পলি জমে ভরাট এবং অবৈধ দখলের কারণে খালগুলো সরু নালায় পরিণত হয়েছে। ফলে পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢলের পানি নদীতে পৌঁছানোর আগেই লোকালয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। লোহাগাড়া ও সাতকানিয়ার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ডলু খালটিও নাব্যতা হারিয়েছে বহু আগেই।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিভিন্ন এলাকায় প্রভাবশালীরা নিজেদের মৎস্যঘের রক্ষায় বা ব্যক্তিগত স্বার্থে প্রাকৃতিক নিষ্কাশন পথ ও স্লুইস গেট বন্ধ করে রেখেছেন। এতে উজান থেকে নেমে আসা পানি দীর্ঘ সময় ধরে আটকে থাকছে বসতবাড়ি ও ফসলি জমিতে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বন্যার এই ভয়াবহতার পেছনে বড় ধরনের প্রভাব রয়েছে দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ ও বিভিন্ন উঁচু সড়কের। পর্যাপ্ত কালভার্ট না থাকায় রেললাইন ও সড়কগুলো অনেক ক্ষেত্রে বাঁধের মতো কাজ করছে, যা পানি নিষ্কাশনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টি ও সমুদ্রের জোয়ারের পানির উচ্চতা বেশি থাকায় বন্যার পানি দ্রুত সাগরে নামতে পারছে না।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী মো. বরকত আলী বলেন, "শুধু বৃষ্টিই বন্যার একমাত্র কারণ নয়। নদী, নালা, পুকুর ও প্রাকৃতিক জলাশয় ভরাট হয়ে যাওয়া এবং অপরিকল্পিত উন্নয়ন কার্যক্রম পানির প্রবাহের পথগুলোকে সংকুচিত বা বন্ধ করে দিয়েছে। রেলপথের নিচে পর্যাপ্ত ব্রিজ বা কালভার্ট না থাকায় পানি বের হতে পারছে না। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী সংকটের দিকে যাচ্ছে।"
দীর্ঘদিন নিয়মিত ড্রেজিং না হওয়ায় সাঙ্গু ও ডলু নদীর তলদেশে পলি ও বালু জমে নদীর ধারণক্ষমতা কমে গেছে। সেইসঙ্গে পাহাড়ি এলাকায় নির্বিচারে পাহাড় কাটার ফলে ধসে পড়া মাটি ও বালু নদী-খালে পড়ে নাব্যতা সংকটকে আরও প্রকট করে তুলছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) পক্ষ থেকে খাল খননের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানানো হলেও, স্থায়ী সমাধানের জন্য একটি সমন্বিত 'হাইড্রোলজিক্যাল পরিকল্পনা'র ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, নিয়মিত ড্রেজিং, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, জলাশয় সংরক্ষণ এবং বিদ্যমান অবকাঠামোয় পানি চলাচলের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে প্রতি বছরই এই দুর্ভোগ পোহাতে হবে দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষকে।

মন্তব্য করুন
মন্তব্য সমূহ
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!