বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর আধুনিকায়নের লক্ষ্যে চীনের তৈরি ২০টি ‘জে-১০ সিই’ (J-10CE) মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান কেনার উদ্যোগ নিয়েছিল সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠনের পরও এই প্রতিরক্ষা নীতি সচল রয়েছে এবং বিমানগুলো কেনার বিষয়ে আলোচনা বেশ ইতিবাচকভাবে এগিয়ে চলছে। শিগগিরই এ সংক্রান্ত একটি চুক্তি সইয়ের সম্ভাবনা দেখছে সরকার।
বর্তমানে পাঁচ দিনের সরকারি সফরে চীনে অবস্থান করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই সফরকালে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং এবং প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তার পৃথক বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে এই যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়টি আলোচনায় স্থান পাবে।
সরকারের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, “চীন থেকে জে-১০ সিই মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান কেনা নিয়ে চূড়ান্ত আলোচনা চলছে। প্রধানমন্ত্রীর সফরে এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা ও নেগোসিয়েশন হবে। তবে এই সফরেই কোনো চুক্তি সই হচ্ছে না; আমরা আশা করছি, খুব শিগগিরই চূড়ান্ত চুক্তিটি সই হবে।”
এর আগে গত শনিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সামরিক কেনাকাটার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম বলেন, “সামরিক ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে আমাদের দ্বিপক্ষীয় চমৎকার সম্পর্ক রয়েছে। তবে সামরিক সরঞ্জাম ক্রয়-বিক্রয়ের সুনির্দিষ্ট আলোচনাগুলো সাধারণত লিডারশিপ পর্যায়ে না হয়ে অপারেটিভ বা কর্মকর্তা পর্যায়ে হয়ে থাকে। তবে সফরে দ্বিপক্ষীয় সামরিক সহযোগিতার সার্বিক বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে।”
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর দীর্ঘমেয়াদী ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’-এর অংশ হিসেবে এই আধুনিক ফাইটার জেটগুলো কেনার প্রক্রিয়া চলছে। বিমান বাহিনীর বর্তমান বহরে থাকা পুরোনো এফ-৭ এবং সীমিত সংখ্যক মিগ-২৯ যুদ্ধবিমানের পরিবর্তন, আকাশসীমার সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদার করতে এই আধুনিক ফাইটার জেটগুলো অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। গত বছরের মার্চে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার চীন সফরের সময় প্রথম এই মাল্টিরোল কমব্যাট এয়ারক্র্যাফট কেনার বিষয়ে আলোচনা হয়, যাতে সম্ভাব্য খরচ ধরা হয়েছে ১৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আ ন ম মুনীরুজ্জামান বলেন, “বাংলাদেশের বর্তমানে যেসব যুদ্ধবিমান রয়েছে সেগুলো বেশ পুরোনো মডেলের। ফলে দেশের আকাশসীমার সুরক্ষায় আমাদের নতুন যুদ্ধবিমানের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। যতদূর জানি, চীন থেকে আধুনিক জঙ্গিবিমান কেনার আলাপ-আলোচনা অনেক দূর এগিয়েছে।”
উল্লেখ্য, জে-১০ সিই যুদ্ধবিমানটি মূলত চীনের বিমানবাহিনীতে ব্যবহৃত জে-১০সি-এর রপ্তানি সংস্করণ। গত বছর ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে আকাশসীমার উত্তেজনায় এই যুদ্ধবিমানটি ব্যবহার করে পাকিস্তান ফ্রান্সের তৈরি ভারতের ‘রাফায়েল’ যুদ্ধবিমান ধ্বংসের দাবি করার পর এটি বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে।
এর আগে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকারের আমলে ২০১৬ সাল থেকে বাংলাদেশের জন্য নতুন যুদ্ধবিমান কেনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। সে সময় ফ্রান্সের রাফায়েল, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ইউরোফাইটার টাইফুন এবং যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এফ-১৬ কেনার বিষয়ে আলোচনা চলে। এমনকি ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাঁক্রো ঢাকা সফরকালে রাফায়েল বিমান বিক্রির আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। তবে বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ আর্থিক সংকটের কারণে সে সময় আলোচনা আর বেশিদূর এগোয়নি।