লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার ভেলাবাড়ি ইউনিয়নের ফলিমারী এলাকায় শিশু নন্দিনী হত্যাকাণ্ডের আসামিকে গ্রেপ্তারকে কেন্দ্র করে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে পুরো এলাকা। পুলিশ-বিজিবির ওপর হামলা, মব ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের অবরুদ্ধ করার ঘটনার পর সেখানে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। বর্তমানে পুলিশি অভিযান ও যৌথ মামলার আশঙ্কায় এলাকা ছেড়ে গা ঢাকা দিয়েছেন স্থানীয় পুরুষেরা।
এদিকে, শিশু নন্দিনী হত্যার ঘটনায় আদিতমারী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলার মূল অভিযুক্ত বিধান চন্দ্র রায় (২২) এবং তার বাবা রনজিৎ কুমারকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার দায়ে আদিতমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) প্রত্যাহার করা হয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সোমবার বিকেল থেকে হঠাৎ নিখোঁজ ছিল ৭ বছর বয়সী শিশু নন্দিনী। পরিবার ও প্রতিবেশীরা অনেক খোঁজাখুজি করেও তার সন্ধান পায়নি। মঙ্গলবার সকালে বাড়ির পাশের একটি ভুট্টাক্ষেতে নরম মাটি দেখে স্থানীয়দের সন্দেহ হয়। পরে মাটি খুঁড়ে সেখান থেকে নন্দিনীর বস্তাবন্দি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য লালমনিরহাট সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাদকসেবী বিধান চন্দ্র প্রতিবেশী নন্দিনীকে ভুট্টাক্ষেতে নিয়ে ধর্ষণ ও হত্যার পর মরদেহ বস্তায় ভরে মাটিতে পুঁতে রেখেছিল।
গতকাল সন্ধ্যায় বিধান চন্দ্রকে ওই ভুট্টাক্ষেত থেকে কোদাল হাতে আসতে দেখেছিলেন এক ব্যক্তি। নন্দিনীর মরদেহ উদ্ধারের পর থেকেই বিধান পলাতক থাকায় বিক্ষুব্ধ জনতা তার বাড়িতে ভাঙচুর চালায়। এ সময় ঘরের ভেতর তালা লাগিয়ে আত্মগোপনে থাকা বিধানকে ধরে ফেলে জনতা।
খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে বিধানকে নিজেদের হেফাজতে নিলে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। উত্তেজিত জনতা আসামিকে ছিনিয়ে নিয়ে গণপিটুনি দেওয়ার দাবিতে 'মব' সৃষ্টি করে এবং পুলিশের ওপর হামলা চালায়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক রাশেদুল হক প্রধান, পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান, এবং বিজিবি ১৫ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মেহেদী ইমামসহ বিপুল সংখ্যক পুলিশ, ডিবি ও বিজিবি সদস্য ঘটনাস্থলে যান। কিন্তু বিক্ষুব্ধ জনতা জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদেরও প্রায় তিন ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখে এবং দফায় দফায় হামলা চালায়।
অবশেষে পুলিশ ৩ রাউন্ড সাউন্ড গ্রেনেড ছুঁড়ে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করে দেয় এবং মূল অভিযুক্ত বিধান ও তার বাবাকে উদ্ধার করে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। এ সময় প্রশাসনের গাড়ি লক্ষ্য করে ব্যাপক ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। জনতার হামলায় লালমনিরহাট পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান এবং আদিতমারী থানার ওসি নাজমুল হকসহ অন্তত ২০ জন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য আহত হন। এছাড়া জেলা প্রশাসকের গাড়িসহ প্রশাসনের ৮টি গাড়ি ভাঙচুর করে বিক্ষুব্ধ জনতা।
নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক রাশেদুল হক বলেন, "এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।"
পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়তে হয়েছে। বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত এবং গাড়ি ভাঙচুর হয়েছে। এই ঘটনায় আদিতমারী থানার ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। শিশু হত্যার মামলার পাশাপাশি সরকারি কাজে বাধা ও হামলার ঘটনায় পৃথক আরেকটি মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
ভেলাবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. আব্দুল করিম জানান, "ঘটনার পর এলাকায় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক ও শান্ত রয়েছে। তবে পুলিশের মামলার ভয়ে জনমনে আতঙ্ক থাকায় গ্রামের অধিকাংশ পুরুষ মানুষ বর্তমানে বাড়ির বাইরে অবস্থান করছেন।"
আদিতমারী থানার পুলিশ পরিদর্শক তাজরুল ইসলাম সর্দার জানান, ফলিমারী এলাকার পরিস্থিতি এখন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।