‘মা, এবার ঢাকা থেকে ফিরে তোমার জন্য নতুন ঘর করে দেব’—মায়ের জরাজীর্ণ ঘরটি নতুন করে গড়ে দেওয়ার এই শেষ প্রতিশ্রুতিটুকু দিয়ে ঢাকায় কাজের সন্ধানে এসেছিলেন বাক্প্রতিবন্ধী তরুণ মেহেদী হাসান মিম (২৪)। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। রাজধানীর বারিধারায় এক ধনীর দুলালের বেপরোয়া প্রাইভেট কারের চাপায় প্রাণ হারাতে হলো তাকে।
গত মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) বিকেলে বারিধারা ডিপ্লোমেটিক জোনের ১ নম্বর সড়কের ফুটপাতে আসরের নামাজ শেষে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন মেহেদী। এ সময় উচ্চগতিতে আসা একটি প্রাইভেট কার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফুটপাতের ওপর উঠে তাকে সজোড়ে চাপা দেয়। রক্তাক্ত অবস্থায় স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে দায়িত্বরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, ঘাতক গাড়িটির চালক ছিল এক কিশোর। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কিশোরটি বাংলাদেশ বিমানের একজন ক্যাপ্টেনের ছেলে এবং তাদের বসবাস গুলশানের আভিজাত্যময় এলাকায়।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) সকালে মেহেদীর লাশ নীলফামারীর ডোমার উপজেলার সোনারায় ইউনিয়নের হাজিপাড়া গ্রামের নিজ বাড়িতে পৌঁছালে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। তিন ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট মেহেদী বাক্প্রতিবন্ধী হলেও পরিবার ও আশপাশের মানুষের কথা খুব ভালোভাবে বুঝতে পারতেন। পড়াশোনা করেছেন ডোমার সরকারি কলেজে। বৃদ্ধ বাবার সামান্য আয়ে সংসার ও জরাজীর্ণ ঘরের কষ্ট লাঘব করতেই সহকর্মীদের সাথে গত সোমবার রাতে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলেন তিনি।
মা মিনু বেগম ছেলের স্মৃতিতে আকুল হয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “রোদের কারণে মাসের শুরুতে তাকে ঢাকায় যেতে দিইনি। সোমবারে যাওয়ার সময় বলে গেল ফিরে এসে নতুন ঘর করে দেবে। সে কথা বলতে পারত না, কিন্তু সব বুঝত। গরিব মানুষ আমরা, ভেবেছিলাম ছেলেটা কিছু আয় করলে ভালো চলবে। কিন্তু এভাবে গাড়ি চাপা দিয়ে মেরে ফেলল আমার ছেলেকে! আমি এর বিচার চাই।”
মেহেদীর মামাতো ভাই সাজ্জাদ চৌধুরী জয় জানান, সহায়-সম্বলহীন এই পরিবারের কোনো আবাদি জমি নেই, শুধু বসতভিটাটুকুই ভরসা। পরিবারের হাল ধরতেই বাক্প্রতিবন্ধী মেহেদী ঢাকায় যান, কিন্তু সেখান থেকে ফিরলেন লাশ হয়ে। বুধবার সকালে পারিবারিক কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে।
ডোমার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি, তদন্ত) আছগর আলী জানান, ঢাকায় সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর স্বজনদের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হয় এবং গ্রামের বাড়িতে তার দাফন সম্পন্ন হয়েছে।