আগামী শুক্রবার (১২ জুন) ঢাকায় পৌঁছাবেন ভারতের নতুন হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক নির্ভরযোগ্য সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

গেল ৫ জুন ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে লেটার্স অব ক্রিডেনশিয়ালস (পত্রাধিকার) গ্রহণ করেন দীনেশ ত্রিবেদী। এর মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশে ভারতের হাই কমিশনার হিসেবে পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব পালনের আইনি ও কূটনৈতিক অনুমোদন লাভ করেন। এপ্রিল মাসে নিয়োগ ঘোষণার পর থেকে তিনি প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন এবং এখন ঢাকায় এসে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির কাছে ক্রিডেনশিয়ালস উপস্থাপন করে আনুষ্ঠানিকভাবে মিশন শুরু করবেন।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক নেতাকে হাইকমিশনার হিসেবে পাঠানো দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে চলমান কূটনৈতিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন সম্ভাবনার প্রেক্ষাপটে দীনেশ ত্রিবেদীর মতো অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদের নিয়োগ এবং আগমন উভয় দেশের মধ্যে সম্পর্ককে নতুন গতি দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

দীনেশ ত্রিবেদী ১৯৫০ সালের ৪ জুন নয়াদিল্লিতে জন্মগ্রহণ করেন। বর্তমানে তার বয়স ৭৬ বছর। তিনি গুজরাটি বংশোদ্ভূত হলেও কলকাতায় বেড়ে উঠেছেন এবং বাংলা সংস্কৃতির সাথে গভীরভাবে যুক্ত। সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ, কলকাতা থেকে বাণিজ্যে স্নাতক এবং যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়, অস্টিন থেকে এমবিএ সম্পন্ন করেছেন। তার রাজনৈতিক জীবন অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। কংগ্রেস দিয়ে শুরু করে জনতা দল, তৃণমূল কংগ্রেস হয়ে ২০২১ সালে বিজেপিতে যোগ দেন।

পশ্চিমবঙ্গ থেকে একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন—রাজ্যসভায় দুবার (১৯৯০-৯৬ এবং ২০০২-০৮) এবং লোকসভায় ব্যারাকপুর কেন্দ্র থেকে ২০০৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত। মনমোহন সিংয়ের মন্ত্রিসভায় তিনি রেলমন্ত্রী এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১৬-১৭ সালে তিনি ‘অসামান্য সংসদ সদস্য’ পুরস্কার লাভ করেন।

গেল এপ্রিলে ভারত সরকার দীনেশ ত্রিবেদীকে বাংলাদেশে নতুন হাই কমিশনার হিসেবে নিয়োগের ঘোষণা করে। তিনি ক্যারিয়ার ডিপ্লোম্যাট প্রণয় কুমার ভার্মার স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন। এটি একটি ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক নিয়োগ। সাধারণত কূটনৈতিক পদে ক্যারিয়ার ডিপ্লোম্যাটদের পাঠানো হয়, কিন্তু বর্তমান স্পর্শকাতর পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদকে বেছে নিয়েছেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ত্রিবেদী যেহেতু বাংলা ভাষায় সাবলীল এবং পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি ও সংস্কৃতির গভীর জ্ঞান রাখেন। তাই বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মোদী সরকার দীনেশকেই ঢাকায় পাঠাচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানান, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের কয়েকটি মূল চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে গঙ্গার পানি বন্টন চুক্তি নবায়ন, তিস্তা নদীর পানি বণ্টন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা, জ্বালানি সহযোগিতা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের জন্য এমন একজন ‘পলিটিক্যাল এনভয়’ প্রয়োজন ছিল যিনি উভয় দেশের রাজনৈতিক মহলে সহজে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারবেন।

ত্রিবেদীর পশ্চিমবঙ্গের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ এবং বাংলা ভাষার দক্ষতা এখানে বিশেষ ভূমিকা রাখবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই নিয়োগের মাধ্যমে ভারত বাংলাদেশকে স্পষ্ট বার্তা দিতে চাইছে যে, দু দেশের সম্পর্ককে আরও গভীর, বন্ধুত্বপূর্ণ এবং বাস্তবসম্মত করতে চায় ভারত।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক শুধু দুই সরকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটির মূল ভিত্তি দুই দেশের জনগণের মধ্যে। এই নিয়োগ একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। দীনেশ ত্রিবেদী শুধু একজন কূটনীতিক নন, তিনি একজন রাজনৈতিক যোগাযোগকারী। তার মাধ্যমে দিল্লি এবং ঢাকার মধ্যে সরাসরি রাজনৈতিক স্তরের আলোচনা সহজ হবে। দীনেশ ত্রিবেদী যদি এই মানুষে মানুষে যোগাযোগকে শক্তিশালী করতে পারেন, তাহলে তার মিশন সফল বলে বিবেচিত হবে।