শিরোনাম
বেশি ব্যয়েই ওয়াসার নজর – প্রথম বেলা

বেশি ব্যয়েই ওয়াসার নজর

পাগলা পয়ঃশোধনাগার পুনর্নির্মাণের নামে ৩ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্প হাতে নিয়েছে ঢাকা ওয়াসা। এতে বর্তমান সময়ের চেয়ে দৈনিক আট কোটি লিটার শোধনক্ষমতা বাড়বে। অথচ বিদ্যমান অবকাঠামো ঠিক রেখে চারটি সার্কুলার সেডিমেন্টেশন ট্যাঙ্ক এবং চারটি স্ক্রু ইনলেট পাম্প স্থাপন করলে দৈনিক ১২ কোটি লিটার শোধনক্ষমতা বৃদ্ধি করা সম্ভব।

এতে বর্তমানের ১২ কোটি এবং নতুন ১২ কোটিসহ ২৪ কোটি লিটার শোধনক্ষমতা দাঁড়াবে। এজন্য ব্যয় হবে ৯৫০ কোটি টাকার কিছু বেশি। কিন্তু ওয়াসা কম ব্যয়ের দিকে না গিয়ে বেশি খরচে মেগা প্রকল্পের দিকে ঝুঁকেছে। পুনর্নির্মাণে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হবে। যার পুরোটাই পানিতে যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান যুগান্তরকে বলেন, ‘সংস্কারের মাধ্যমে পাগলা পয়ঃশোধনাগারের সক্ষমতা বৃদ্ধি করে বহুদিন ব্যবহার সম্ভব। আমি নিজে প্রকল্প এলাকা ঘুরে সব দেখে এসেছি। যেখানে সামান্য সংস্কার করলে শোধনাগারটি ব্যবহারযোগ্য থাকছে, সেখানে বিপুল অর্থ খরচের কী প্রয়োজন।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ঢাকা ওয়াসার মেগা প্রকল্প এবং প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই সংক্রান্ত কার্যক্রম প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এ কারণে তাদের প্রকল্প সংক্রান্ত সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদন বা পরামর্শ প্রতিষ্ঠানের স্টাডি রিপোর্টগুলো বাস্তবায়নের আগে তৃতীয় কোনো প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে যাচাই-বাছাই করে নেয়া উচিত। তিনি বলেন, আমরা ঢাকা ওয়াসার এত মেগা প্রকল্প দেখতে চাই না। আমরা চাই, স্বল্প খরচে কার্যকর ফলাফল। মেগা প্রকল্পের নামে জনগণের অর্থের নানা অব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে। প্রকল্পের ব্যয় অনুযায়ী সুফল পাচ্ছে না ঢাকাবাসী।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১৯৭৭ সালে পাগলা পয়ঃশোধনাগার নির্মাণের পর ১৯৯০-১৯৯১ সালে জাপানের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় পুনর্নির্মাণ করে সরকার। এ পয়ঃশোধনাগারের বর্তমান দৈনিক পয়ঃবর্জ্য শোধনসক্ষমতা ১২ কোটি লিটার। নতুন করে দুটি সার্কুলার সেডিমেন্টেশন ট্যাঙ্ক এবং দুটি স্ক্রু ইনলেট পাম্প স্থাপন করলে এর সক্ষমতা ১৮ কোটি লিটারে উন্নীত হবে।

আর বর্তমান অবকাঠামোর কিছু সংস্কার করে আরও দুটি সার্কুলার সেডিমেন্টেশন ট্যাঙ্ক ও দুটি স্ক্রু ইনলেট পাম্প স্থাপন করলে সক্ষমতা ২৪ কোটি লিটারে উন্নীত করা সম্ভব। কিন্তু ঢাকা ওয়াসা পয়ঃশোধনাগারের সক্ষমতা দৈনিক ২০ কোটি লিটারে উন্নীত করতে ৩ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করেছে।

নতুন প্রকল্পের আওতায় পয়ঃশোধনাগার ভেঙে নতুন করে তৈরি করতে মেগা প্রকল্প গ্রহণ করেছে। অথচ বাংলাদেশের আবহাওয়ার জন্যও বর্তমান শোধনাগারটি খুবই উপযোগী। স্বল্প খরচে কার্যকর একটি শোধনাগার। এটি ভেঙে বেশি মেকানিক্যাল ও কেমিক্যাল-নির্ভর প্রযুক্তির দিকে এগোচ্ছে ঢাকা ওয়াসা।

এ ব্যাপারে পাগলা পয়ঃশোধনাগার পুনর্নির্মাণ প্রকল্প বা ঢাকা স্যানিটেশন ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্টের পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ‘অনেক যাচাই-বাছাই করে পাগলা পয়ঃশোধনাগার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এখানে কোনো ভুলত্রুটি বা অপচয়-দুর্নীতির কোনো কারণ দেখছি না।’

এ প্রকল্প সংশ্লিষ্ট আরেক প্রকৌশলী মো. সেলিম মিয়া যুগান্তরকে বলেন, ‘পাগলা পয়ঃশোধনাগার পুনর্নির্মাণের যে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, এটা যৌক্তিক। প্রসঙ্গত, গত ১০ মার্চ প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন পেয়েছে। বাংলাদেশ সরকার এবং বিশ্বব্যাংক যৌথভাবে এ প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থায়ন করছে। এখন বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় এগোচ্ছে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানটি।

এ প্রসঙ্গে প্রকৌশল বিশেষজ্ঞ ম. ইনামুল হক যুগান্তরকে বলেন, ‘ঢাকা ওয়াসার কোনো জবাবদিহিতা নেই। এ কারণে প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরা যা খুশি, তা-ই করে চলেছেন। সরকারও ওয়াসার কাজের ব্যাপারে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করছে না।’

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, পাগলা পয়ঃশোধনাগার প্রকল্পের সঙ্গে ৯০০ কিলোমিটার পয়ঃবর্জ্য সংযোগ লাইন রয়েছে। ১৯৮৮ সাল থেকে মোহাম্মদপুর, তেজগাঁও, গুলশান, বনানী, বারিধরা এলাকার ২০০ কিলোমিটার পয়ঃবর্জ্য সংযোগ লাইন হাতিরঝিলে বিচ্ছিন্ন রয়েছে। এ পর্যন্ত এ এলাকার পয়ঃসংযোগ লাইন পুনঃসংযোগের উদ্যোগ গ্রহণ করেনি ওয়াসা। হাতিরঝিলের দু’পাশের লিফট স্টেশনের মধ্যে পুনঃসংযোগ করে বিদ্যমান লাইনগুলো সংস্কার করলেই সচল করা সম্ভব হবে।

অন্যদিকে ২০০৪ সালে ধোলাইখাল বক্সকালভার্ট নির্মাণের সময় প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়েছে ওই এলাকার পয়ঃনিষ্কাশন লাইন। পরবর্তী সময়ে বিকল্পভাবে স্বল্প পরিমাণ পয়ঃবর্জ্য পাগলা পয়ঃশোধনাগারে নেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। রুটিন রক্ষণাবেক্ষণ কাজের অংশ হিসেবে ঢাকা ওয়াসার এসব পয়ঃবর্জ্য লাইন রক্ষণাবেক্ষণ করার দায়িত্ব থাকলেও তারা সেটা করেনি।

উপরন্তু সেবা না দিয়েও গ্রাহকদের কাছ থেকে বছরে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার পয়ঃনিষ্কাশন বিল তুলে নিচ্ছে। পুরনো পয়ঃবর্জ্য লাইনগুলোর সংস্কার চিন্তা না করেই নতুন ৪৬২ কিলোমিটার পয়ঃবর্জ্য লাইন নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে ওয়াসা। নতুন করে এসব পাইপলাইন তৈরিতে নগরবাসী অন্তহীন দুর্ভোগের কবলে পড়বে। যানজটে স্থবির হয়ে পড়বে পুরান ঢাকাসহ নগরীর দক্ষিণাংশের বেশির ভাগ এলাকা।

জানা গেছে, এর আগেও ওয়াসা একাধিক মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে; কিন্তু সেগুলোর সফল বাস্তবায়ন হয়নি। অথচ ব্যয় হয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকা। প্রকল্পগুলো চালু রাখতে গিয়ে লোকসান বাড়ছে। ঋণের চক্র থেকে বেড় হতে পারছে না প্রতিষ্ঠানটি। এই ক্ষতি পোষাতে গিয়ে পানির দাম বাড়ানো হচ্ছে। পয়ঃশোধন সেবা না দিয়েও অর্থ আদায় করা হচ্ছে।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, সরবরাহ লাইন না করেই ৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ব্যয়ে পদ্মাপানি শোধনাগার প্রকল্প বাস্তবায় করেছে ওয়াসা। ফলে প্রকল্পটি চালুর পর দৈনিক ৪৫ কোটি লিটার পানি ওয়াসার সরবরাহ লাইনে যুক্ত হওয়ার কথা থাকলেও ওয়াসা দৈনিক মাত্র ১৫ কোটি লিটার পানি উৎপাদন করছে।

দৈনিক ৩০ কোটি লিটার কম পানি উৎপাদন করায় বৈদেশিক ঋণ, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং ঋণের সুদ টানতে গিয়ে বছরে ওয়াসার বার্ষিক ক্ষতি হচ্ছে অন্তত ২০০ কোটি টাকা। অন্যদিকে সাভারের তেঁতুলঝোড়া ও ভাকুর্তা এলাকায় ৫৭৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ৪৬টি গভীর নলকূপ স্থাপন করেছে ওয়াসা।

সেখান থেকে দৈনিক ১৫ কোটি লিটার পানি ঢাকায় আনার টার্গেট ছিল ওয়াসার। স্থানীয় জনগণের বিক্ষোভের মুখে মাত্র দৈনিক ৫ কোটি লিটার পানি আনা যাচ্ছে। বিশাল অঙ্কের টাকা ব্যয় করে সামান্য পরিমাণ পানি আনায় ওয়াসাকে লোকসান গুনতে হচ্ছে।

0 Reviews

Write a Review

Read Previous

ছাত্রদল পুনর্গঠন নিয়ে তৃণমূলে অসন্তোষ

Read Next

করোনাকালে দেশে ফিরেছেন ১ লাখ ২৭ হাজারেরও বেশি প্রবাসী

%d bloggers like this: