শিরোনাম
যাত্রা – প্রথম বেলা

যাত্রা

যোশীয় জ. দাস

২৬ বছর পেরিয়েই এই প্রথম বার ঘড়ির কাটা 
যেন ঠিক নয়টা পনের মিনিট এবং আমি অপেক্ষা করছি খুলনা রেল ষ্টেশনে সাথে বড় বড় দুটো বড় ভারি ব্যাগ। আমার গন্তব্য পার্বতীপুর। ২০০৯ সালে যখন মাত্র কলেজে উঠেছি তখন একবার উত্তরবঙ্গে গেছিলাম স্বপ্নপুরী দেখতে। এবার একেবারে চলে যাচ্ছি। পার্বতীপুর স্টেশন হলো ফুলবাড়ি স্টেশনের পরের স্টেশন। আমার এই যাওয়া কিছুটা অপ্রত্যাশিত। আমি চাকরী ছেড়ে দেওয়ার সমস্ত সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা যখন করেছি তখনই আমার পদ্দোন্নতি এবং বদলি হলো। আমি খুবই খুশি হয়েছিরাম যে আমি প্রাণের শহর খুলনা হতে দূরে কোথাও যেতে পারব। আমি নিজেও মনে মনে বহুদিন ধরে শুধু এই শহর থেকে অন্য কোথাও চলে যেতে চাইছি। একটা চাপা অভিমান আর রাগ নিয়ে আমি তন্ন তন্ন করে সমস্ত উপায় বের করেছি শুধু এই শহর ছেড়ে চলে যাওয়ার। আজ আমি সেই মহেন্দ্রক্ষণে দাড়িয়ে। 
যেখানে আমাকে আটকানোর কেউ নেই, নেই কেউ বিদায় জানানোর। আমি শুধু একা। এই জীবন আমার, এই সিদ্ধান্ত আমার। আমার প্রথমবার এমন দূরের ট্রেন যাত্রা। ট্রেন ছাড়তে দেরি হচ্ছে। আমি বারে বারে পিছনে তাকাচ্ছি। কিসের জন্য যেন আমার অস্থিরতা, কারো জন্য যেন আমার অপেক্ষা। এই শহর ছেড়ে যাওয়া মানে আমার কাছে মৃত্যু তা আমি এই প্রথমবার বুঝতে পারছি। মনে হচ্ছে কেউ যেন প্রবাহমান গভীর স্্েরাতের সামনে একটা বাঁধ দিয়ে নদীকে আটকে সবটুকু বেদখল করে নিচ্ছে। কিন্তু এমন তো হওয়ার কথা না, জীবন তো স্বাধীন, মুক্ত ও স্বত›ত্র। জীবন তো কারো কাছে আটকে থাকে না। তাকে তো পরাধীনতার শিখলে আটকানো যায় না। জীবনকে তো কোন বাঁধ দিয়ে আটকে দেওয়া যায় না কারণ জীবন সমুদ্রের স্রোতের রাতের চেয়েও প্রবল, মাথার উপরে বিস্তৃত সীমাহীন আকাশের চেয়েও মুক্ত। আমার এখনো মনে পড়ে একবার মায়ের বকুনি খেয়ে সারাদিন পালিয়ে বেড়িয়েছি এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে সন্ধ্যা অবধি। সেই দিন প্রথম বুঝেছিলাম জীবন যদি স্বাধীন হয়, জীবন যদি মুক্ত হয়, জীবন যদি স্বত›ত্র হয় তবে জীবন কতই না সুন্দর! আর জীবনকে যদি আটকে রাখা হয় তাহলে সেই জীবন আমার কাছে সত্যিই বিষাদময়। তাই একপাশে সান্ত¡না আর একপাশে যন্ত্রণা নিয়ে আমি ছেড়ে যাচ্ছি এই প্রাণের শহর আর আমায় ভালবাসাকে। এত শত ভাবতে ভাবতেই আমার অজান্তে আমার চোখের কোণ ভিজে উঠেছে। কেউ দেখে ফেলার আগেই লুকিয়ে চোখ মুছে নিলাম। এই কান্না আমার একাকীত্বের কান্না, এই কান্না  ঋতুকে ছেড়ে যাওয়ার কান্না। আমি কখনো কখনো শক্ত হয়েছি, নিষ্ঠর আর সব একা একা সিদ্ধান্ত নিয়েছি আর যেগুলোতে আমি দিনশেষে হেরে গেছি। কখনো কখনো পাথরের মত শক্ত হয়ে একা একা গহীন বনে ঝরণার মত কেদে চলেছি অঝোরে। 
সেই কান্নার আবার একটা গল্প আছে, সেই কান্নার একটা প্রেম আছে। অবশেষে ট্রেন থামল প্লাটফর্মে। আমি ট্রেনে উঠে সিটে বসে পড়লাম। ট্রেন ছুটে চলেছে গন্তব্য আর পিছনে পড়ে থাকছে আমার বেড়ে উঠার এই শহর, আমার ভালবাসার এই শহর। আজ আমার সারা রাতের সঙ্গী হলো ভীষণ একাকিত্ব আর দুচোখের জল। এই গভীর রাতে গাঢ় অন্ধকারে তাকিয়ে আছি চুপ করে। ট্রেনের এই বিশাল শব্দ যেন মিলে যাচ্ছে দূরের কোন এক গ্রামে। ট্রেন ভর্তি মানুষ। কেউ নেমে যায় আবার কেউ উঠে পড়ে এই যাত্রায়। অন্যদের কাছে সেদিন নেহাত ট্রেন যাত্রা হলেও আমার কাছে এটাকে জীবনই মনে হয়েছে। সারা রাত এদিক সেদিক ভাবতে ভাবতে একটা সময় মুয়াজ্জিনের কন্ঠে আজানের ধ্বনি আমাকে জানিয়ে দিল শেষ হতে চলেছে আমার যাত্রা। আমি আমার গন্তব্যে চলে আসছি। আমার গন্তব্য পার্বতীপুর। ট্রেন থেকে নামতেই দেখলাম শত মানুষের ভিড়ে আমার সহকর্মী আমাকে খুজছেন। আমাকে দেখেই মৃদু হাসিতে উষ্ণ অর্ভ্যথনা জানালেন। পার্বতীপুর ষ্টেশন থেকে আমার অফিস মাত্র পাঁচ টাকার রাস্তা। রেল লাইনের পাশেই শত বছরের পুরানো বাড়িতে আমাদের অফিস। পরিচালক মহাদয়ের অনুমতিতে অফিসের একটা ঘর আমার জন্য সুন্দর পরিপাটি করে রাখা হয়েছে। আমি স্নান সেরে একটু বিশ্রামের জন্য সময় নিলাম। দুপুরের খাবার খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম মাত্র পরিচিত হওয়া বৃত্তকে নিয়ে। এবার ঘুরে দেখার পালা। ঘুরতে বের হওয়ার আগেই সেদিনই যে যোগদান করছি কাজে সেই ব্যাপারটা আমি আমার সহকর্মীকে জানালাম। ঘুরতে ঘুরতে যখন মধ্য আকাশের সূর্য পশ্চিমের দিকে ডুবে যাচ্ছে তখনই মনে পড়ে গেল আমার ভালবাসার ঋতুকে। ঋতু থাকলে এই বিকাল হতো আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ বিকাল। ঋতুর হাত ধরে হাটলে পৃথিবীর সমস্ত কষ্ট যেন নিমিষেই উড়ে যায়। ভালবাসাগুলো এমনই হয়। ভালবাসার মানুষের সাথে কাটিয়ে দিতে চাই এমন সারাজীবনের বিকাল। একটা দিনের যেমন সকাল, দুপুর আবার এমন বিকাল হয় তেমনি আমাদের জীবনেও এমন সময় আসে। আমাদের জীবন একটা যাত্রা। সারি সারি ষ্টেশন। ষ্টেশন ভর্তি মানুষ। কেউ উঠে আবার কেউ নেমে যায়। শুধু থেকে যায় আমাদের স্মৃতি। আর এই স্মৃতি হলো টিকেট। যার সাহায্য আমরা পেরিয়ে যায় গন্তব্য। অর্থনীতিতে পড়েছি মানুষের অভাব অসীম, সীমাহীন। আমার কাছে মনে হয়েছে মানুষের এই গন্তব্য সীমাহীন। মানুষের এই পথ চলা নিরন্তর। এই যাত্রা ভালবাসার। এই যাত্রা বেঁচে থাকার। এই যাত্রার ভালবাসার মানুষকে ছুঁয়ে দেখার। এই যাত্রা পরিপূর্ণতার। এই যাত্রা মৃত্যুর। এই যাত্রা নতুন জীবনের। এই যাত্রা নতুন আনন্দের।

0 Reviews

Write a Review

Read Previous

খুলনা খ্রিষ্টিয়ান সম্প্রদায়ের প্রি-ক্রিসমাস ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান

Read Next

চট্রগ্রামে নৌ আঞ্চলিক স্কাউটস এর ১২ তম সমাবেশ অনুষ্ঠিত

%d bloggers like this: