শিরোনাম
ভয় – প্রথম বেলা

ভয়

সেপ্টেম্বরের এক সকাল। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। এমন বৃষ্টি নীহারিকার পছন্দ নয়। ভীষণ মনমরা লাগে।নীহারিকা তার স্কুলের সব থেকে বেশী অন্তর্মূখী এবং লাজুক মেয়ে। তার সহপাঠিদের মত নাচ, গান, আবৃত্তি, অভিনয়ে সে অংশগ্রহন করে না। বেশী কথা বলা এবং শোনা কোনটিই তার ভালো লাগে না। তাই প্রায়ই তাকে ঠাট্টা করে অনেক কিছু বলা হয়। তাকে নিয়ে ক্লাসে মুখ টিপে হাসাহাসি করা হয়। ক্লাসে সে দম বন্ধ করে বসে থাকে আর শিক্ষকদের কথা শুনে চুপচাপ নোট নেবার চেষ্টা করে। নীহারিকাদের ক্লাস ক্যাপ্টেন দুজন। রাতুল আর মনিকা। এরা দুজনেই দুর্দান্ত মেধাবী আর সাহসী। রাতুল আর মনিকা দুজনেই নীহারিকার বন্ধু এবং প্রতিবেশী। ক্লাসে নীহারিকার সংক্ষিপ্ত নাম নীহু। মনিকাই নামটি দিয়েছে। এই নামটি তার ভীষণ পছন্দ। ক্লাসে বসে নীহুর জানালার দিকে তাকিয়ে থাকার অভ্যাসটি রাতুল খুব ভালো ভাবেই জানে। নীহারিকা যখন তাকিয়ে ছিল ঠিক তখনই সোনিয়া আর কিশোর মিলে নীহারিকার ব্যাগে একটি প্লাস্টিকের টিকটিকি রেখে দিল। রাতুল দেখে ফেলল। মূহুর্তের মধ্যে গিয়ে সে কিশোরের পাশে দাড়াল আর তাকে ইঙ্গিত করল যে টিকটিকি টি যেন নীহুর ব্যাগ থেকে বের করে ফেলে। কিশোরের ইশারায় সোনিয়া যেই সেটা নীহুর ব্যাগ থেকে বের করতে গেল তখনি নীহু দেখে ফেলল। ব্যাপারটি বুঝতে তার সময় লাগলো না। কৃতজ্ঞতার দৃষ্টি নিয়ে সে রাহুলের দিকে তাকালো। স্কুলের সবাই জানে নীহু সরীসৃপ জাতীয় প্রানীদের ভীষন ভয় পায়। এসব ভয় আর লজ্জার কারণে প্রায়ই তাকে সহপাঠীদের হাতে হেনস্তা হতে হয়। লজ্জায় সে শিক্ষক দের বলতেও পারে না। পাছে যদি তারা বলে বসে যে এইটুকু তেই এত ক্ষেপে যাবার কি আছে!!!

ক্লাসে তিন চারজন ছেলে মেয়ের সাথে নীহারিকার একটু ভালো বন্ধুত্ব আছে। তারা ওর প্রতিবেশী। আজকাল তাদের কেও সে এড়িয়ে চলে। কারণ একটিই। কোন ভাবে যদি তার বন্ধুরা জানতে পারে যে নীহারিকা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যাচ্ছে আর ক্লাসে কিংবা স্কুলে সেটা ছড়িয়ে পড়ে তবে তা ভয়াবহ লজ্জার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। এমনিতেই তো তাকে নিয়ে ঠাট্টার শেষ নেই। এরপর পাগল উপাধিটিও পেতে বিলম্ব হবে না।বাসাতে লজ্জার কারণে এসব কথা কারো সাথে বলাও সম্ভব হয়ে ওঠে না। অগ্যতা নিজেকে গুটিয়ে রাখা ছাড়া কোন উপায় নেই।

নীহারিকার সামনে পরীক্ষা। জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেটের এই পরীক্ষায় সবারই ভয় পাবার কথা। কিন্তু নীহারিকার ভয় পরীক্ষা নিয়ে নয়। পরীক্ষার নম্বর গুলো এবং প্রতিযোগীতা তাকে খুব বেশী টানে না। তার এই হেয়ালির কারণে নীহারিকার মামণি মিসেস জিনাত রায়হান অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। তিনি ভেবেই পাচ্ছেন না মেয়েকে কিভাবে আশি শতাধিক নম্বর পাবার জন্য ব্যস্ত করে তুলবেন। অন্যদিকে রায়হান সাহেব তার অফিস আর পারিবারিক ব্যবসার কাজে ভীষণ ব্যস্ত। একমাত্র মেয়ে নীহারিকা তার চোখের মণি। মেয়ের কাগজ পত্রের ওপর লিখিত ফলাফল নিয়ে তিনি চিন্তিত নন। নীহারিকা ভালো মেয়ে, বাধ্য থাকে, যখন তখন বাইরে যাবার বায়না ধরে না এটুকু তেই রায়হান সাহেব খুশী। মিসেস জিনাত রায়হান তার মেয়ের পাঁচ বছর বয়সের থেকেই লক্ষ করেছেন সে অন্ধকার কে ভীষণ ভয় পায়। নীহারিকার ঘরে সারা রাত বাতি জ্বলে। বাতি নিভিয়ে ঘুমানো তার পক্ষে অসম্ভব। শুধু অন্ধকারই নয়। খুব জোরে কথা বললে নীহারিকা ভয়ে কেঁপে ওঠে। সে মাঝে মাঝেই অনেক কিছু ভুলে যায়। ইদানীং তার খাবারেও অনীহা হচ্ছে। মিসেস রায়হান তার স্বামীকে পারিবারিক ব্যবসার কাজে সাহায্য করেন। রায়হান সাহেবের অধিক ব্যস্ততার কারণে বাসার সবকিছু দেখাশুনা আর মেয়ের পড়াশুনা নিয়ে তাকেই ব্যস্ত থাকতে হয়। বাসার কাজের জন্য তার দুজন সহযোগী থাকায় সেগুলো নিয়ে মিসেস রায়হান এর খুব একটা চাপের সম্মুখীন হতে হয় না।

নীহারিকা একটু মোটা। মুখে কিছু দাগ আর গায়ের রঙ কালো হবার কারণে সাজগোজের প্রতি সে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। তার চারপাশের কোন কিছুই তাকে আকর্ষণ করে না। সে যখন ক্লাস ফাইভে পড়ে তখন এক দুর্ঘটনা ঘটেছিল। বৃষ্টির কারণে পা পিছলে স্কুলের মাঠে পড়ে গিয়েছিল। সাথে সাথেই কিছু ছেলে মেয়ে তাকে ঘিরে দাঁড়ায় আর হাসাহাসি করতে থাকে। সেই ঘটনার পর থেকেই নীহারিকা এখন স্কুলের মাঠে খেলাধুলা কিংবা হাঁটাচলা করতেও ভয় পায়। আরও বিপদ ঘটল যখন দুমাস আগে তার গ্রীষ্মের ছুটির সময় বড় মামা আর মামি তাদের বাসায় বেড়াতে আসল। বড় মামি আবিষ্কার করে বসল নীহারিকা স্বাভাবিক ভাবে চিন্তা করছে না কিংবা তার জীবন যাপন স্বাভাবিক নয়। তার জোরাজুরিতেই নীহারিকার বাবা একজন শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞ খুঁজলেন এবং তার সাথে কথা বললেন। কিন্তু নীহারিকা কোনভাবেই সেই ডাক্তারের কাছে যাবে না। আশেপাশের লোকজন আর তার সহপাঠিরা জেনে গেলে সে লজ্জায় বাসা থেকে বের হতে পারবে না।

টিফিন বিরতিতে নীহু রাতুল, মণিকা, শাম্মী আর সুজয়ের সাথেই থাকে। রাতুল আর মণিকা ক্লাশ ক্যাপ্টেন তাই তাদের তাড়াহুড়ো থাকে। শাম্মী খুব ভালো আঁকতে পারে। ও সেটা নিয়েই থাকে। সুজয় ভারী মিশুক আর রসিক। টিফিনের সময় সবাই ওকে ঘিরে রাখে ওর মজার মজার কথার জন্য। রাতুল মণিকার কাছ থেকেই জানল যে গত সপ্তাহে টিফিন পিরিয়ডে নীহু ক্লাসে একা একা বসে কাঁদছিল।রাতুল ভাবল হয়ত কোন কারণে তার মন খারাপ ছিল। আজ যখন দেখল নীহু চুপি চুপি টিফিন বক্সে রাখা দু টুকরো কেক আর প্রিয় খাবার বাটার বন ডাস্টবিনে ফেলে দিল তখন রাতুলের কিছুটা সন্দেহ হলো। আজ একরকম জোর করেই নীহু সুজয়ের জোকস গুলো শুনে হাসার চেষ্টা করছে। কেউ জোর করে হাসলে তার হাসির শব্দ খুবই অদ্ভুত হয়। নীহু হয়ত বুঝতে পারছে না তার হাসির শব্দ খুব অদ্ভূত লাগছে শুনতে!!!

কিছুদিন পরের কথা। রায়হান সাহেব নীহারিকা কে বার বার ডাক্তারের কাছে যাবার জন্য বলছেন। নীহারিকা বুদ্ধি করে তার বাবা কে জানালো জেএসসি পরীক্ষার আগে সে যাবে না। তিনি সেটা মেনে নিলেন।তার ব্যস্ততার কারণে তিনি ঘূণাক্ষরেও টের পেলেন না যে নীহারিকা ভীষণ ভাবে ডিপ্রেশনে আক্রান্ত। তাছাড়া এগারো/বারো বছরের মেয়ের আবার ডিপ্রেশনই বা হবে কি কারণে!!! সেপ্টেম্বর প্রায় শেষ হতে চলল। অক্টোবরের পূজার ছুটির আগেই স্কুলের জেএসসি পরীক্ষার্থীদের টেস্ট পরীক্ষা নেবার কারণে শিক্ষক রা ভীষণ ব্যস্ত। নীহু দের ক্লাশে যেন কারো দম ফেলার ও সময় নেই। দু একদিন ধরে ঘুম থেকে উঠেই নীহুর মনে হচ্ছে এই পৃথিবী তার জন্য নয়। তার প্রতিদিনের কঠোর নিয়ম কানুনের মধ্যে এক ধরণের ভয় তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। সেই ভয়ে আছে নিরাসক্তি আর হতাশার ছায়া। মিসেস রায়হান বাবুর্চিকে বাসার অন্য কাজে লাগিয়ে এখন নিজেই রান্না করছেন। কিন্তু তাতে নীহারিকার খাবারে প্রতি আগ্রহের কোন উন্নতি হচ্ছে না। নীহুর চোখের নীচে কালো দাগ তার মোটা কালো চশমার নীচে লুকিয়ে থাকলেও শাম্মি আর মণিকার চোখ তা এড়ায়নি। তারা কথা বলতে চেয়েছিল কিন্তু নীহু তাতে আগ্রহী ছিল না।শেষ টেস্ট পরীক্ষার দিন নীহু রীতিমত বিধ্বস্ত অবস্থায় পরীক্ষার হলে ঢুকল। তার হাত কাঁপছে। চোখ যেন বন্ধ হয়ে আসছে। প্রায় পনেরো দিন ধরে সে রাতে ঘুমাতে পারে না। বাসায় কেউ বুঝতে পারেনি। রায়হান সাহেব ময়মনসিংহের গ্রামের বাড়ীর জমি জমা সংক্রান্ত জটিলতায় ভীষন ব্যস্ত। কিছুদিন সেখানেই ছিলেন। পরীক্ষার শেষ ঘন্টা যেই পড়ল সবাই উল্লাসে হল থেকে বের হয়ে আসল। সুজয়, শাম্মি আর মণিকা আগে গিয়ে নীহুর কাছে দাঁড়াল। নীহুর চেহারার ক্লান্তি দেখে তারা বিস্মিত হলো!!!

রাতের খাবারের সময় মিসেস রায়হান নীহারিকার পরীক্ষা এবং তার পরবর্তী পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলতে চাইলেন। তিনি স্পষ্ট ভাবেই বুঝলেন মেয়ে কথা বলতে আগ্রহী নয়। একটু রাগত হয়েই মেয়ের সাথে তর্ক শুরু করে দিলেন।ফলাফলে মেয়েও উত্তেজিত হয়ে গেল। মিসেস রায়হান হঠাৎ লক্ষ্য করলেন নীহারিকার দম আটকে যাচ্ছে। সে কথা বলতে পারছে না।দু হাত দিয়ে নিজের মাথা চেপে ধরে আছে। চোখ বড় বড় হয়ে কোটর থেকে বের হয়ে আসছে যেন। মুহূর্তেই তিনি ধরে ফেললেন নীহারিকার প্যানিক অ্যাটাক হচ্ছে।এটা এক ধরণের নিয়ন্ত্রনহীন আতংক। নীহারিকার সাত বছর বয়সে পর পর দুবার হয়েছিল। একবার স্কুলে আর একবার বাসাতে। প্রাথমিক ভাবে মিসেস রায়হান মেয়েকে কিছুটা শান্ত করেই মনোরোগ বিশেষজ্ঞের ক্লিনিকে নিয়ে গেলেন।

সেখানে নীহারিকাকে কিছু থেরাপি এবং কাউন্সিলিং সেশনের মধ্য দিয়ে যেতে হলো। প্রায় ১৭ দিন পর ডাক্তার যা বললেন সেটা শুনে রায়হান সাহেব আর তার স্ত্রী দুজনেই বিস্মিত। নীহারিকা নাকি প্রায় দু বছর ধরেই প্রচন্ড ডিপ্রেশনে ভুগছে। তার একাকীত্বের কারণে এক ধরণের বিষন্নতা তৈরী হয়েছে। স্কুলের ছেলেমেয়েদের ঠাট্টা, বিদ্রæপ, বাবার ব্যস্ততা, মায়ের কঠোরতা , বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার না করতে পারা, তীব্র অন্তর্মূখী আচরণের কারণে মস্তিষ্কের ওপর চাপ, এসব কিছু ধীরে ধীরে তার ওপর কাজ করেছে। খিটখিটে মেজাজ, নিদ্রাহীনতা, খাবারের অরুচি এসব থেকেই এসেছে। পরীক্ষার শুরুতেই নীহারিকার নার্ভাস ব্রেক ডাউন হয়েছিল। কেউ সেটা বুঝে উঠতে পারেনি। ওষুধ আর থেরাপি সাময়িক ভাবে কাজ করবে। কিন্তু তাতে মানসিক দূর্বলতা কাটবে না! তাছাড়া কয়েক মাস নীহারিকা তার মস্তিষ্কের ওপর কোন চাপ দিতে পারবে না। থেরাপি আর বিশ্রামে কাজ না হলে ক্লিনিকে ভর্তি হয়ে যেতে হবে। দীর্ঘদিনের এই ভয় আর একাকীত্ব মূলত নীহারিকার জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে রেখে যাবে।

রায়হান সাহেব বুঝতে পারলেন যে তার রাজকুমারী কে তিনি ভয়ের সাথে লড়াই করা শেখাতে পারেননি। রাতুল, মণিকা, শাম্মী, আর সুজয় বুঝতেই পারেনি যে তারা নীহুর বন্ধু হয়েও তাকে সঙ্গ দিতে পারেনি। ক্লাসে বসে চুপি চুপি কাঁদা আর জোর করে সুজয়ের জোকস শুনে হাসার চেষ্টার কারণ নীহু স্বাভাবিক ভাবে দেখানোর চেষ্টা করেছিল। তাতে কোন লাভ হয়নি। সে নিজেই অস্বাভাবিক হয়ে পড়েছে। মিসেস রায়হান ঘূণাক্ষরেও ভাবতে পারেনি মানসিক অবসাদ, ভয়, আর বিষন্নতা নীহারিকাকে এভাবে বিষিয়ে তুলবে।

নভেম্বরের এক বিকেলবেলা…… নীহু তার শোবার ঘরে রাখা ইজি চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে। দীর্ঘদিন ধরে ঠিক ভাবে না খেতে পারার কারণে তার শরীর ভীষন ক্লান্ত থাকে। পুষ্টিহীনতার একধরণের লক্ষণ। একভাবে বসে থাকতেও কষ্ট হয়। তাই তার বাবা এই ইজিচেয়ারের ব্যবস্থা করেছেন। কলিংবেল বাজল। রাতুল, মণিকা আর শাম্মী এসেছে। আজকাল প্রায় বিকেলেই তারা নীহুর বাসায় আসে। সবাই মিলে গল্প করে। মিসেস রায়হান ওদের জন্য নিজের হাতে নাস্তা বানান। বছরের ঠিক এই সময়ে বিকেল সাড়ে চারটার দিকে এক চিলতে হালকা রোদ নীহুর ঘরের জানালা গলে ঢুকে পড়ে। তাপহীন বাসন্তী রঙা এই রোদ নিয়ে নীহু কখনো মাথা ঘামায়নি। কিন্তু আজ এত দিন পরে কেন জানি এই রোদ ছুয়ে দেখতে ইচ্ছে হলো তার। একটু পাশ ফিরে হেলান দিয়ে নীহু দেখল রাতুল সুজয়ের জোকস বলার ভঙ্গিমা অনুকরণ করে দেখাচ্ছে। তাই দেখে শাম্মী আর মণিকা হেসে কুটি কুটি হচ্ছে। হঠাৎ করেই নীহুর মনে হলো তার মামণি কে সে কখনও বলেনি যে তার গানের গলাটা ভীষণ মিষ্টি। আজ এই কথাটা বলতে হবে!!!

সিনথীয়া তিথি

কবি, লেখিকা ও প্রাবন্ধিক

0 Reviews

Write a Review

Read Previous

তরুণদের স্বপ্নের কথা শুনলেন প্রধানমন্ত্রী

Read Next

রাঙ্গুনিয়ায় ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপন কমিটির উদ্যোগে জশনে জুলুস অনুষ্ঠিত

%d bloggers like this: